কয়লা পাচারকাণ্ডে ইডি-র মেগা তল্লাশি: তদন্ত চলাকালীনই নথিপত্র ও ল্যাপটপ নিয়ে বেরোলেন মুখ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কয়লা পাচার মামলার তদন্তকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার কলকাতার রাজপথে এক নজিরবিহীন নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ। রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC)-এর কর্ণধার তথা তৃণমূলের আইটি সেল প্রধান প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি-র তল্লাশি চলাকালীন সশরীরে পৌঁছে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, তদন্তকারীদের নজর এড়িয়ে প্রতীক জৈনের ঘর থেকে ল্যাপটপ ও হার্ড ডিস্ক সহ একাধিক নথিপত্র হাতে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়, যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনীতিতে।

বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকেই কয়লা পাচার মামলার আর্থিক তছরুপের তদন্তে কলকাতার লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাসভবন এবং সল্টলেকে আই-প্যাকের অফিসে হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে চলে এই তল্লাশি। একই সঙ্গে দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের মোট ১০টি জায়গায় এই অভিযান চালানো হয়। ইডি সূত্রের দাবি, কয়লা পাচারের ‘কালো টাকা’ হাওলা মারফত আই-প্যাকের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে বলে তাঁদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।

বেলা গড়াতেই নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাটি। আই-প্যাক কর্ণধারের বাড়িতে সশরীরে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। ২০১৯ সালে সিবিআই যখন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে হানা দিয়েছিল, তখন মুখ্যমন্ত্রী ধরনায় বসেছিলেন। তবে এবার তিনি এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি তল্লাশি চলাকালীন বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েন।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি ঘটে যখন মুখ্যমন্ত্রী প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর হাতে তখন দেখা যায় বেশ কিছু ফাইল, একটি ল্যাপটপ এবং হার্ড ডিস্ক। উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তিনি অভিযোগ করেন ইডি তদন্তের নামে তৃণমূলের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রণকৌশল হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, প্রতীক জৈন দলের একজন দায়িত্বশীল কার্যকর্তা। তাঁর ব্যক্তিগত ল্যাপটপে দলের অত্যন্ত গোপন তথ্য রয়েছে, যা কয়লা পাচারের তদন্তের আওতায় পড়ে না। এই ঘটনার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি দায়ী করে এই অভিযানকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যা দেন মুখ্যমন্ত্রী।

তদন্তের মাঝপথে নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার এই ঘটনাকে ‘তদন্তে বাধা দান’ এবং ‘প্রমাণ লোপাট’ হিসেবে দেখছে ইডি। কেন্দ্রীয় এজেন্সির দাবি, তল্লাশি প্রক্রিয়া পিএমএলএ (PMLA) আইন অনুযায়ী চলছিল। মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশের হস্তক্ষেপে তদন্তের তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে। এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দ্বারস্থ হয়েছে ইডি। আগামীকালই এই মামলার জরুরি শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।

২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আসানসোল ও দুর্গাপুর খনি এলাকা থেকে কয়লা চুরির অভিযোগে অনুপ মাজি ওরফে ‘লালা’-র বিরুদ্ধে মামলা করে সিবিআই। ইডি-র দাবি, এই পাচারের কোটি কোটি টাকা প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছেছে। এর আগে এই মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।

তদন্ত চলাকালীন কোনো ব্যক্তি কি এভাবে নথিপত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে পারেন? মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ কি কেবলই রাজনৈতিক কৌশল না কি এর পেছনে বড় কোনো ‘তথ্য’ ফাঁসের ভয় রয়েছে? শুক্রবার হাইকোর্টের শুনানিতেই সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *