অভিযোগ-বিপরীতে পাল্টা দাবি, প্রশ্ন—আসলে সত্য কোথায়?
নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ: গ্রামীণ উন্নয়নে পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। স্থানীয় সরকারের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করা জেলা পরিষদগুলোর প্রধান দায়িত্ব হলো কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের তহবিল সঠিকভাবে ব্যবহার করে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। কিন্তু মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদকে ঘিরে সম্প্রতি যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নই নয়, বরং জনগণের ট্যাক্সের টাকা অপচয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা খরচ করতে না পারায় তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ফেরত চলে গেছে, যা জেলার উন্নয়নে এক বড় ধাক্কা। এই ঘটনা শাসক দলের প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ
গ্রামীণ রাস্তাঘাট, নিকাশি ব্যবস্থা, ভাঙন রোধ—সব ক্ষেত্রেই জেলায় এক ভয়াবহ অব্যবস্থার ছবি তুলে ধরেছে বিরোধীরা।
- সাগরদিঘীর কাবিলপুরে টানা চার মাস ধরে রাস্তার দাবিতে চলছে আন্দোলন।
- ভগবানগোলার একাধিক রাস্তায় হাঁটুজল জমে আছে।
- নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে।
জেলা পরিষদের বিরোধী সদস্য তৌহিদুর রহমান সুমন বলেন—
“গোটা জেলায় গ্রামীণ রাস্তাগুলো বেহাল, ভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ নেই, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। অথচ ২৩৭ কোটি টাকা ফেরত গেছে। এটা জেলাবাসীর কাছে লজ্জাজনক ও দুর্ভাগ্যজনক।”
প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ চক্রবর্তী আরও সরাসরি আক্রমণ করে বলেন—
“টাকাটা আমাদের, জনগণের। জেলা পরিষদের নয়, রাজ্য সরকারেরও নয়। ২৩৭ কোটি টাকা ফেরত মানেই অযোগ্যতার নিদর্শন।”
বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র প্রশ্ন তুলেছেন দুর্নীতির অভিযোগে। তাঁর বক্তব্য—
“আইন অনুযায়ী এই টাকা ফেরত যাওয়ার নিয়ম নেই। হয় কাজ হয়নি, আর যদি কাজ হয়ে থাকে তবে হয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে। উন্নয়ন কোথায়? রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, নরদমা ভর্তি জল, ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার আশঙ্কা। আসলে জেলা পরিষদ আর রাজ্য সরকার একে অপরের পরিপূরক দুর্নীতি।”
তৃণমূলের পাল্টা দাবি
অভিযোগ একেবারেই অস্বীকার করেছেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা। তাঁর দাবি—
“এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। বিরোধীরা ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। কিছু মাস আগে হয়তো অর্ধেক অর্থ খরচ হয়নি, কিন্তু এখন পুরো অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কোনো টাকা ফেরত যায়নি।”
বড় প্রশ্ন—সত্য কোথায়?
একদিকে বিরোধীরা দাবি করছে অযোগ্যতা ও দুর্নীতির কারণে ২৩৭ কোটি টাকা ফেরত গেছে, অন্যদিকে তৃণমূল শাসিত জেলা পরিষদ বলছে—একটাকাও ফেরত যায়নি, বরং বরাদ্দ পুরোপুরি খরচ হয়েছে। তাহলে সব টাকা যদি উন্নয়নে খরচ হয়ে থাকে তাহলে রাস্তা ঘাটের বেহাল দশা কেন? সম্প্রতি মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদে কাজ দেখা সোনার জন্য মেন্টর নিয়োগ করেছে পঞ্ছায়েত দপ্তর। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সব কাজ যদি ঠিক ভাবে হত তাহলে মেন্টর নিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ত না।
তাহলে আসল সত্যটা কী? টাকা ফেরত গেছে নাকি বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ মাত্র? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়। তবে বিরোধীরা যেভাবে দুর্নীতি, অব্যবস্থা আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে, তাতে জেলা পরিষদের উপর চাপ বাড়ছেই।
মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের বিরুদ্ধে ২৩৭ কোটি টাকা ফেরত যাওয়ার অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে এটি স্থানীয় সরকারের জবাবদিহিতার উপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। উন্নয়নের কাজ যেখানে থমকে আছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত যাওয়া কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, এটি জনগণের আস্থাকেও দুর্বল করে। এই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত স্বচ্ছতার মাধ্যমে। জেলা পরিষদকে অবিলম্বে সঠিক নথিপত্র এবং ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত যাতে সাধারণ মানুষ জানতে পারে তাদের টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ এই বিতর্ক চলতে থাকবে এবং রাজনৈতিক আরোপ-প্রত্যাঘাতের আড়ালে আসল সত্য চাপা পড়ে যাবে।