প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাজনীতি নয়, কার্নিভাল বাংলার গর্ব

উত্তরকন্যা থেকে বিরোধীদের কড়া জবাব মুখ্যমন্ত্রীর

নিউজ ফ্রন্ট, উত্তরকন্যা, ৭ অক্টোবর ২০২৫:

উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় পরিদর্শনের পর আজ বিকেলে উত্তরকন্যা থেকে সাংবাদিক বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বৈঠকে তিনি একদিকে যেমন বিপর্যস্ত এলাকার ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান দিলেন, তেমনই অন্যদিকে দুর্যোগের সময় কলকাতা কার্নিভাল করা এবং উদ্ধার কাজ নিয়ে ওঠা সমস্ত রাজনৈতিক কটাক্ষের কড়া জবাব দিলেন। বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “৪ তারিখ ভোর ৫টায় ডিজি ও মুখ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠক করি। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী এবং উদ্ধারকারী দল অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। একটি দুর্যোগের পরে উদ্ধারকাজে সময় লাগে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা — আমরা সেই সময় দিয়েছি এবং ধাপে ধাপে কাজ করেছি।”

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় ভয়াবহ বৃষ্টিতে প্রচুর বাড়ি, রাস্তা এবং সেতু ভেঙে পড়েছে। জল নেমে গেলে ফিল্ড স্টাডি শুরু হবে। মমতা বলেন, “এখন যদি আমরা ভিআইপি দলবল নিয়ে যেতাম, জেলা প্রশাসন উদ্ধারকাজ ছেড়ে আমাদের দেখাশোনায় ব্যস্ত হয়ে যেত। সেটাই কি যুক্তিসঙ্গত হতো?”

নিহত পরিবারের সদস্যদের চেক দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী

মমতা জানান, এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ-ছ’জন শিশু। নিহতদের মধ্যে ১৮ জন মিরিক-কালিম্পঙে, পাঁচ জন নাগরাকাটায় এবং দু’জন নেপাল ও ভুটানের নাগরিক। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, “মানুষ মারা গিয়েছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগে, অথচ বলা হচ্ছে সেতু ভেঙে মৃত্যু হয়েছে। মহারাষ্ট্র, হিমাচল, উত্তরাখণ্ডেও তো সেতু ভেঙেছে — আমরা কি সেটা নিয়ে রাজনীতি করেছি?”

দুর্যোগে কয়েক কোটি টাকার বিদ্যুতের খুঁটি জলের তলায় চলে গিয়েছে। শর্টসার্কিট বা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো দুর্ঘটনা রোধে সতর্কতার সঙ্গে মেরামতির কাজ চলছে। মমতা জানান, “এখানে ১২ ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ৫৬টি নদীতে জল ছাড়ার ফলে তিস্তা ও অন্য নদীগুলির জল বেড়েছে। প্রকৃতিকে অত্যাচার করলে তার ফল ভোগ করতেই হবে।”

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য শুকনো খাবার, জামাকাপড়, গ্যাস এবং রান্নার উপকরণসহ ত্রাণ কিট বিলি শুরু হয়েছে। মিরিক ও নাগরাকাটায় কমিউনিটি কিচেন চালু করা হয়েছে, যা চলবে যতদিন দুর্গতরা নিজেদের ঘরে ফিরতে না পারেন। নিহতদের পরিজনদের হাতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ১৫ দিনের মধ্যে চাকরি দেওয়া হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

 কার্নিভাল বিতর্কে সরাসরি জবাব

দুর্যোগের সময় কলকাতায় দুর্গাপুজোর কার্নিভাল নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে মমতা বলেন,

“কার্নিভাল বাংলার ঐতিহ্য ও গর্ব। অনুষ্ঠান আগে থেকেই ঠিক ছিল — তা রাতারাতি বাতিল করা সম্ভব ছিল না। আমরা যদি ওই দিনই যেতাম, প্রশাসন উদ্ধারকাজ ছেড়ে আমাদের দেখাশোনায় ব্যস্ত হয়ে যেত। হোয়াট ইজ দ্য প্রায়োরিটি — ভিআইপি সামলানো, না মানুষের জীবন বাঁচানো?”

বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কেন্দ্রের সহযোগিতা না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। “বাংলাকে এক টাকাও দেওয়া হয়নি। তবু আমরা নিজেদের সামর্থ্যে লড়ছি। দু’দিন অপেক্ষা করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না — মানুষের জীবনটাই আগে,” বলেন তিনি। মমতা জানান, বুধবার দুপুরে তিনি নবান্নে ফিরবেন এবং এরপর খড়্গপুর যাবেন। নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও সরকারি নিয়োগ সংক্রান্ত কাজ চলবে। আগামী সপ্তাহের সোমবার আবার উত্তরবঙ্গে ফেরার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দুর্যোগের রাতেই প্রশাসন সতর্ক করেছিল, তাই আরও বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। উদ্ধারকাজে তাঁদের আন্তরিকতা অসাধারণ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *