নিজস্ব সংবাদদাতা, মুর্শিদাবাদ: শহরের নামী এক বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসার গাফিলতি এবং চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে রণক্ষেত্র হয়ে উঠল হাসপাতাল চত্বর। ১৩ বছরের এক নাবালিকার ভুল চিকিৎসার জেরে তার চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর উপক্রম হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছে রোগীর পরিবার। অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা রোগীর আত্মীয়দের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ এনেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রিপোর্ট ছিঁড়ে ফেলা থেকে শুরু করে হাতাহাতি—চিকিৎসক ও রোগীর পরিবারের দ্বন্দ্বে ফের প্রশ্নের মুখে শহরের চিকিৎসা পরিষেবা।
১৩ বছরের ওই নাবালিকার পরিবারের দাবি, কিছুদিন আগে চোখের সমস্যা নিয়ে তারা ওই হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু চিকিৎসার পর মেয়েটির চোখের অবস্থার উন্নতি হওয়ার বদলে ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। বর্তমানে সে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

উদ্বিঘ্ন পরিবার অন্য জায়গা থেকে চোখ পরীক্ষা করিয়ে সেই নতুন রিপোর্ট নিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে যান। অভিযোগ, সেই রিপোর্ট দেখা তো দূরের কথা, চিকিৎসকরা তাচ্ছিল্যভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। বচসার এক পর্যায়ে এক চিকিৎসক ক্ষিপ্ত হয়ে রোগীর পরিবারের সামনেই সেই রিপোর্টটি ছিঁড়ে ফেলেন বলে অভিযোগ।
পরিবারের আরও দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষাকেন্দ্র (ল্যাব) থেকেই টেস্ট করানোর জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিল। এর প্রতিবাদ করলেই জুটছিল অপমান। রিপোর্ট ছেঁড়ার প্রতিবাদ করতে গেলে চিকিৎসকের নির্দেশে হাসপাতাল কর্মীরা রোগীর অভিভাবকদের ওপর চড়াও হয় এবং ধাক্কাধাক্কি ও মারধর করে বলে অভিযোগ।
যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবি, রোগীর পরিবারের আচরণ ছিল অত্যন্ত উস্কানিমূলক। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁরা অকারণে উচ্চস্বরে চিৎকার শুরু করেন এবং অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করেন। রিপোর্ট নিয়ে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে তাঁরা হাসপাতালের সম্পত্তির ওপর হামলা চালান এবং ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ কর্তৃপক্ষের। তাঁদের দাবি, চিকিৎসকরা আক্রান্ত হয়েছেন, মারধর করা হয়নি।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে খবর দেওয়া হয় স্থানীয় থানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ইতিমধ্যেই রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় ভুল চিকিৎসা, মারধর এবং রিপোর্ট নষ্ট করার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনা মুর্শিদাবাদের চিকিৎসা মহলে ফের বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। একদিকে যেমন চিকিৎসকদের একাংশের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা, বাণিজ্যিক মানসিকতা (টেস্ট করানোর চাপ) এবং রোগীর সঙ্গে রুক্ষ আচরণের অভিযোগ উঠছে, যা ‘সেবা’র মূল মন্ত্রের বিরোধী। অন্যদিকে, অভিযোগ বা ক্ষোভ থাকলেই হাসপাতালে ভাঙচুর চালানো বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও সমানভাবে নিন্দনীয়।
আইনের পথে তদন্তে যারাই দোষী সাব্যস্ত হোক না কেন, এই ঘটনা প্রমাণ করল চিকিৎসা পরিষেবা, রোগীর আস্থা এবং হাসপাতালের পেশাদারিত্বের মধ্যে এক বড় ফাটল তৈরি হয়েছে, যা মেরামতের জন্য উভয় পক্ষকেই আরও মানবিক ও সংযত হওয়া প্রয়োজন।