ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বাংলার ভুলে যাওয়া বিদ্রোহীদের সম্মান জানাল কমিটি
নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতা, ২৮ অক্টোবর ২০২৫:
সান্তোষপল্লী জগদ্ধাত্রী পুজোর ১৩তম বর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হলো মহা ধুমধামের সঙ্গে। এবারের থিম “বাংলার ডাকাত”, যা ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে সামনে এনেছে। উপস্থিত ছিলেন বিধাননগরের বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, বিধাননগর পুরনিগমের মেয়র-ইন-কাউন্সিল দেবরাজ চক্রবর্তী এবং আরও অনেকে।
অভিনব পান্ডেল নকশা : গুহার ভিতরে ইতিহাসের যাত্রা
অনন্য গুহা-শৈলীতে নির্মিত পান্ডেলের প্রবেশদ্বারে রয়েছে একটি মনমুগ্ধকর জলপ্রপাত। দর্শকদের ভিতরে প্রবেশের জন্য বলতে হয় “বাংলার ডাকাত”! এই জাদুকরী শব্দগুচ্ছ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে জলপ্রপাতের জলধারা থেমে যায় এবং পান্ডেলের দরজা খুলে যায়, দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে নিয়ে যায় বাংলার ডাকাতদের জগতে।
শিল্পকর্ম, আলোকসজ্জা ও ভাস্কর্যের মাধ্যমে পান্ডেল তুলে ধরেছে সেই সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা। “বাংলার ডাকাত” থিম এই ভুল বোঝা মানুষগুলিকে প্রতিরোধ ও সাহসের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে, যারা তাদের নিজস্ব নির্ভীক পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
এই থিম দর্শকদের মনে করিয়ে দিতে চায় যে ইতিহাস সবসময় সাদা-কালোয় লেখা হয় না। যাদের ব্রিটিশরা ‘দস্যু’ আখ্যা দিয়েছিল, তারা আসলে ছিলেন দরিদ্রদের রক্ষাকর্তা এবং মাতৃভূমির রক্ষক। এই উপস্থাপনা বাংলার অদম্য প্রতিরোধের চেতনা ও স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে সমান্তরাল টানে।

থিমের ভাবনা ও শিল্প নির্দেশনা করেছেন সুমন শিকদার। “বাংলার ডাকাত” থিমের মাধ্যমে পুজো কমিটি তুলে ধরেছে এমন সব বাংলার সন্তানদের কাহিনি, যাদের ব্রিটিশ শাসকরা ‘ডাকাত’ বলে চিহ্নিত করেছিল, অথচ তাঁরা ছিলেন প্রকৃত অর্থে বিদ্রোহী ও সমাজরক্ষক। দর্শনার্থীরা “বাংলার ডাকাত” বললেই সেই জলপ্রপাত থেমে গিয়ে খুলে যায় মণ্ডপের দরজা, যেন এক জাদুকরি প্রবেশপথ।
এই থিমে স্পষ্ট বার্তা ইতিহাস সবসময় সাদা-কালো নয়। যাদের অপরাধী বলা হয়েছে, অনেক সময় তারাই ছিলেন জনগণের রক্ষাকর্তা, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিঃশব্দ বিপ্লবী। আলোকসজ্জা, মূর্তি ও শিল্পস্থাপনার মাধ্যমে সেই যুগের সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে জীবন্ত করে তুলেছে সান্তোষপল্লী জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটি।
কমিটির সভাপতি রতন মৃধা বলেন, “আমাদের এবারের থিম ‘বাংলার ডাকাত’ আসলে সেই ভুলে যাওয়া বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, যারা শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এই পুজো আমাদের বাংলার সাহস ও আত্মসম্মানের প্রতীক।”

শুধু শিল্প বা আয়োজনেই নয়, সমাজসেবাতেও এবার অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে সান্তোষপল্লী জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটি। তারা ৩০ জন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ৫০ জন আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুর দায়িত্ব নিয়েছে, এবং দুর্বল শ্রেণির পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
ভক্তি, ইতিহাস ও সমাজসেবার এই মেলবন্ধনে সান্তোষপল্লী জগদ্ধাত্রী পুজো শুধু এক উৎসব নয়, বরং বাংলার আত্মপরিচয় ও সংগ্রামী চেতনার এক অনবদ্য উদ্যাপন।