বিহার দঙ্গল.. কৌশলে ধার দিচ্ছে দলগুলি

পাটনা, ১০ অক্টোবর, ২০২৫:
বিহারের রাজনীতিতে ফের শুরু হয়েছে মহাযুদ্ধ। নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ চরমে উঠেছে। জাতীয় স্তরেও মর্যাদাপূর্ণ এই নির্বাচন এখন আর শুধু দুই জোটের লড়াই নয় — একাধিক নতুন দলের আগমন ও প্রার্থী পরিবর্তনের ফলে তা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, এবারের বিহার বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে দুই ধাপে। প্রথম দফার ভোট হবে ৬ নভেম্বর, দ্বিতীয় দফার ভোট ১১ নভেম্বর এবং ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা হবে ১৪ নভেম্বর। মোট ২৪৩টি আসনের জন্য ভোটগ্রহণ হবে। এই নির্বাচনে প্রতিটি দল ও জোট নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছে।

এই নির্বাচনী দঙ্গল মূলত দুটি প্রধান জোটের মধ্যে সংঘটিত হবে। প্রথমটি হল এনডিএ জোট, যেখানে বিজেপি, জেডিইউ, জিতেন রাম মাঁঝির হাম পার্টি, এলজেপি এবং উপেন্দ্র কুশওয়াহার দল একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তারা রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। অপরদিকে, মহাগঠবন্ধন বা ইন্ডিয়া জোটে রয়েছে আরজেডি, কংগ্রেস, সিপিআই (এমএল) লিবারেশন এবং অন্যান্য বামপন্থী দল। তারা বিহারের ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে পূর্ণ শক্তিতে ময়দানে নেমেছে।

🔍 ভোটের মূল ইস্যু

বিহার নির্বাচনে এবারও জাতপাত সমীকরণ বড় ভূমিকা নিতে চলেছে। জাতিগত গণনা (Caste Census) প্রকাশের পর সংরক্ষণ বৃদ্ধি ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির উন্নয়ন প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। এনডিএ ও মহাগঠবন্ধন উভয়েই এই সংরক্ষণ বৃদ্ধির কৃতিত্ব নিজেদের বলে দাবি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় স্তরেও সংরক্ষণ নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হল রাজ্যের বিশেষ মর্যাদার দাবি। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরে বিহারের জন্য বিশেষ মর্যাদা চেয়ে আসছেন। বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে, এনডিএ জোট উন্নয়ন, সুশাসন ও কেন্দ্রীয় কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিকে প্রচারের মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্বোধন করা উন্নয়ন প্রকল্প ও “সুশাসন বাবু” ইমেজ নীতীশের দলকে নতুন করে শক্তি দিচ্ছে।

দুই প্রধান জোটের বাইরেও কিছু নতুন রাজনৈতিক মুখ এবারের নির্বাচনে চমক দিতে পারে। ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর তাঁর “জন সুরাজ পার্টি” নিয়ে বিহারের রাজনৈতিক ময়দানে নেমেছেন। তিনি জাতি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সমর্থন চেয়ে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন।

প্রথমবারের মতো বিহার বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে আম আদমি পার্টি (AAP)। দিল্লিতে ক্ষমতা হারানোর পর বিহারে তাদের প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনই বলা কঠিন। বিশ্লেষকদের মতে, আপ বিহারে নিজের রাজনৈতিক জমি তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য তা বড় পদক্ষেপ হবে।

এছাড়া, আসাদউদ্দিন ওয়েইসির নেতৃত্বাধীন এআইএমআইএম (AIMIM) ও রাজ্যের বামপন্থীরা এবারও কয়েকটি আসনে প্রভাব ফেলতে পারে। গত নির্বাচনে বামপন্থীরা এবং  এআইএমআইএম ১৬টি আসন পেয়েছিল, তাই এবারও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০২০ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিন দফায়। প্রথম দফায় ৭১টি আসনে ভোট হয় ২৮ অক্টোবর, দ্বিতীয় দফায় ৯৪টি আসনে ৩ নভেম্বর এবং তৃতীয় দফায় ৭৮টি আসনে ৭ নভেম্বর। ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা হয় ১০ নভেম্বর ২০২০।

সে সময় এনডিএ জোট মোট ১২৫টি আসনে জয়ী হয়, আর মহাগঠবন্ধন পায় ১১০টি আসন। অন্যান্য দল মিলে ৭টি আসন পায় এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন। নির্বাচনের পর নীতীশ কুমার পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেন। তাঁর মন্ত্রিসভায় তর্কিশোর প্রসাদ ও রেণু দেবীকে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। অন্যদিকে, তেজস্বী যাদব বিরোধী দলের নেতা হন এবং মহাগঠবন্ধনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বিধানসভার নতুন স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন বিজয় কুমার সিনহা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের এই নির্বাচন শুধু রাজ্য রাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। জাতপাতভিত্তিক রাজনীতি, উন্নয়ন ও নেতৃত্বের সমীকরণ—এই তিনটি দিকেই নজর রয়েছে সমগ্র দেশের।

এনডিএ কি তাদের পুরনো জোট ধরে রাখতে পারবে? নাকি ইন্ডিয়া জোট নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করবে? প্রশান্ত কিশোর কি ভোটের ময়দানে নতুন চমক দেখাবেন? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ১৪ নভেম্বরের গণনা ফলাফলে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *