প্রশ্নপত্র ফাঁস রহস্যের সূত্র ধরে পশ্চিমবঙ্গে তদন্ত | আদালতের নির্দেশে তল্লাশি
নিউজ ফ্রন্ট, মধ্যমগ্রাম, উত্তর ২৪ পরগনা— বিহারের কনস্টেবল নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডের তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। এই কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মধ্যমগ্রামের একটি ছাপাখানার নাম উঠে আসায় আজ সেখানে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এর আধিকারিকরা তদন্তে এসেছেন।
সম্প্রতি বিহারে কনস্টেবল নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর বিহারের কনস্টেবল পদে ২১ হাজার ২৯১টি শূন্যপদের জন্য ১৮ লাখ পরীক্ষার্থী ৩৭টি জেলার ৫২৯টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেন। এই কেলেঙ্কারির তদন্ত করতে গিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি সামনে আসে। প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর ওই পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়। তদন্তকারী সংস্থার পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিহারের এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মধ্যমগ্রামের একটি ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছিল।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আজ ইডি’র একটি বিশেষ দল দেশব্যাপী ১১টি স্থানে একযোগে অভিযান চালায়। কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম ছাড়াও বিহারের পাটনা ও নালন্দা, ঝাড়খণ্ডের রাঁচি এবং উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ে তল্লাশি চালানো হয়।
ইডি আধিকারিকরা ছাপাখানার কাগজপত্র, রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র খুঁটিয়ে দেখেছেন। এছাড়াও কলকাতার একজন আইনজীবীর দফতরেও তল্লাশি চালানো হয়েছে।
তদন্তকারী দলের নেতৃত্বে রয়েছেন ইডি’র উচ্চ আধিকারিকরা। এই অভিযানে একাধিক স্থান থেকে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
এই দুর্নীতি কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ইডি ও বিহার পুলিশ যৌথভাবে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে কৌশিক কর ও সঞ্জয় দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন সুমন বিশ্বাস। লখনউ থেকে একই চক্রে যুক্ত সৌরভ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এছাড়াও কলকাতার দুটি ছাপাখানার কর্ণধারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে এই প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, বিহারের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কীভাবে আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল এবং এর সাথে মধ্যমগ্রামের ছাপাখানার কী সংযোগ রয়েছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
ইডি’র অভিযোগ অনুযায়ী, কলকাতার প্রিন্টিং সংস্থাগুলি শুধু বিহার পুলিশের প্রশ্নপত্র ছাপায়নি। ২০২৪ সালে এমবিবিএস, বিডিএস, আয়ুষে ভর্তির জন্য নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ছাপানো হয়েছে কলকাতার এই সংস্থাগুলি থেকে। একই পদ্ধতিতে নিট পরীক্ষার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হয়েছে।
ইডি’র তদন্তে উঠে এসেছে যে প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর কলকাতার সংস্থাগুলি সরাসরি বিহার সরকারকে প্রশ্নপত্র না পাঠিয়ে বিহারের পাটনার একটি সংস্থার গোডাউনে পাঠায়। ৬ দিন সেখানে প্রশ্নপত্রগুলি ছিল। দুর্নীতি চক্রের মাথা বিহারের সঞ্জীব মুখিয়া ও তার গ্যাংয়ের সদস্যরা ওই প্রশ্নপত্রগুলি চুরি করে। এরপর সেই প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
ইডি’র দাবি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ছাড়াও ওই প্রিন্টিং সংস্থাগুলির মাধ্যমে নিট ও বিহারের কনস্টেবল পরীক্ষা দুর্নীতির বিপুল টাকা চক্রের মাথাদের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে পাচার হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বিহারের কনস্টেবল নিয়োগ দুর্নীতি শুধুমাত্র একটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সাথে পশ্চিমবঙ্গের সংযোগ পাওয়া যাওয়ায় এটি আন্তর্রাজ্য অপরাধের রূপ নিয়েছে। ইডি’র দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন ভুয়া সংস্থার মাধ্যমে বিহারে এই দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা ওই রাজ্য থেকে পাচার হয়েছে। এই অর্থ পাচারের ক্ষেত্রেও কলকাতার প্রিন্টিং সংস্থাগুলির ভূমিকা রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ইডি আধিকারিকরা জানিয়েছেন, তদন্তে যেসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেই অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পর বিহারের কনস্টেবল নিয়োগ কেলেঙ্কারির আরও ব্যাপক মাত্রার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এই দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকতে পারে একাধিক রাজ্যের লোকজন।
তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ইডি সূত্রে জানানো হয়েছে।