নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর
মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে রেশম শিল্পকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করে তুলতে শুক্রবার অনুষ্ঠিত হলো রেশম কৃষি মেলা ২০২৬। কেন্দ্রীয় রেশম উৎপাদন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কেন্দ্রীয় সিল্ক বোর্ড–এর যৌথ উদ্যোগে ৯ জানুয়ারি আয়োজিত এই মেলায় জেলার পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রেশম চাষি, গবেষক ও আধিকারিকরা এক ছাদের তলায় মিলিত হন।
বহরমপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় রেশম উৎপাদন অনুসন্ধান ও প্রশিক্ষণ সংস্থা–এর প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই মেলার উদ্বোধন করেন মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা। তিনি ফিতে কেটে এবং প্রথা মেনে তুঁত গাছে জল দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন।
উদ্বোধনী ভাষণে রুবিয়া সুলতানা বলেন, রেশম শিল্প মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলির অন্যতম। আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিল্পকে আরও লাভজনক করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি মজবুত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
মেলার মূল লক্ষ্য ছিল রেশম চাষিদের আয় বৃদ্ধি, তাঁদের স্বনির্ভর করে তোলা এবং রেশম শিল্পের ভবিষ্যৎকে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানো। এদিন রেশম চাষের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মানের তুঁত চারা ও বীজ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পলু পোকার লালন-পালন, সুতো উৎপাদনের আধুনিক কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

মেলায় উপস্থিত চাষিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়—কীভাবে তুঁত গাছের ডাল কেটে চারা তৈরি করতে হয়, কীভাবে সেই চারা মাঠে রোপণ করতে হয়, রোগ-পোকার হাত থেকে তুঁত গাছ রক্ষা করার কৌশল, স্বল্প খরচে জলসেচ পদ্ধতি, উপযুক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং হলুদ আঠার ফাঁদ প্রয়োগের পদ্ধতি।
এছাড়াও প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্টলে পলু পোকার ডিম থেকে পোকা হওয়া, পোকা লালন করে গুঁটি তৈরি, সেই গুঁটি থেকে সুতো বের করা এবং সুতো দিয়ে পোশাক তৈরি করে বাজারজাত করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে তুলে ধরা হয়।
এই উপলক্ষে কেন্দ্রীয় রেশম উৎপাদন অনুসন্ধান ও প্রশিক্ষণ সংস্থার অধিকর্তা এস গান্ধী দাস বলেন,
“কেন্দ্রীয় সিল্ক বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে রেশম চাষিদের আয় দ্বিগুণ করাই আমাদের লক্ষ্য। আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কম খরচে বেশি উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা উন্নত প্রজাতির তুঁত গাছ ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে রাজ্যে বছরে প্রায় ২২০০ মেট্রিক টন রেশম সুতো উৎপাদন হয়। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা বাড়িয়ে বছরে ৪৪০০ মেট্রিক টনে পৌঁছনোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
এস গান্ধী দাস জানান, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহে মূলত রেশম চাষ হয়। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় তসর চাষ এবং উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার ও কালিম্পং জেলায় মুগা সুতোর চাষ হচ্ছে। রাজ্যে উৎপাদিত মুগা সুতোর ডিম উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা রেশম চাষিদের আর্থিকভাবে উপকৃত করছে।
এই মেলায় মুর্শিদাবাদ ছাড়াও বীরভূম, নদীয়া-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলার রেশম চাষিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বহরমপুর মহিলা থানার ওসি ময়ূরী ঘোষ, বহরমপুরের বিধায়ক সুব্রত মৈত্র সহ অন্যান্য আধিকারিক ও জনপ্রতিনিধিরা।
আয়োজকদের আশা, এই ধরনের রেশম কৃষি মেলা চাষিদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে এবং আগামী দিনে মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।