কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভাসছে বহরমপুর! নিকাশির দুরবস্থা ঘিরে ফুঁসছে শহরবাসী

নিউজ ফ্রন্ট, বহরমপুরঃ মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুর, যা একসময় তার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল, বর্তমানে উন্নয়নের জোয়ারের বদলে বৃষ্টির জলে ভাসছে। নিকাশি ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থা এবং পৌর প্রশাসনের উদাসীনতা শহরটিকে এক জলমগ্ন নরকে পরিণত করেছে। রাতভর ভারী বৃষ্টির পর শহরের অধিকাংশ এলাকা এখন জলবন্দি, আর এই দুর্গতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।

শনিবার রাতভর বৃষ্টির ফলে বহরমপুরের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি তথ্য বলছে, শনিবার রাত থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত শুধুমাত্র বহরমপুর শহরেই ১৫১.৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ এমন পরিস্থিতির মোকাবিলায় নিকাশি ব্যবস্থা একেবারেই অকেজো। প্রতিবছর বর্ষা এলেই বহরমপুরবাসী এই যন্ত্রণা ভোগ করেন। অথচ নিকাশি ব্যবস্থার কোনও স্থায়ী উন্নয়ন হয়নি। পুরসভা ড্রেন সংস্কারের কাজ শুরু করলেও সময়মতো তা শেষ না করায় বর্ষার আগে কোনও প্রস্তুতিই ছিল না। এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতেই শহরের দুর্বল নিকাশি ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। বৃষ্টির জল ড্রেনের নোংরা জলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে, যা স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শহরের গোরাবাজার, মোহনমোড়, রানিবাগান, নাটাতলা মোড়, গীর্জার মোড়, ইন্দ্রপ্রস্থ, এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঝিলপাড়া সহ একাধিক রাস্তা ও এলাকা জলমগ্ন। অলিতে-গলিতে, এমনকি বাড়ির সামনেও হাঁটুসমান জল জমেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র এবং সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ব্যারাক স্কোয়ারেও একই চিত্র। শহরের এমন করুণ অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু লোককে জাল ফেলে মাছ ধরতেও দেখা গেছে, যা একদিকে যেমন হাস্যকর, তেমনই অন্যদিকে শহরের অবহেলিত অবস্থার চরম চিত্র তুলে ধরে।

শহরের এমন দুরবস্থায় তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত বহরমপুর পৌরসভার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র। তাঁর অভিযোগ, উন্নয়নের নামে নাগরিকদের সঙ্গে প্রহসন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের নিকাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে শুধু দায়সারা কাজ করা হয়েছে, যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে শহরবাসীকে।

অন্যদিকে পৌরপিতা নাড়ুগোপাল মুখার্জি পরিস্থিতির দায় নিতে অনিচ্ছুক। তিনি বলেছেন, “বর্ষায় সব জায়গাতেই সমস্যা হয়। রাত থেকে ভোর অবধি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এর ফলেই শহরের কিছু এলাকা জলমগ্ন। পৌরসভার সকলে মিলে জল নামানোর চেষ্টা করছে।” তার এই মন্তব্যে নাগরিকদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তারা বলছেন, “প্রতি বছরই বর্ষায় এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, আর প্রতি বছরই আমরা একই ধরনের অজুহাত শুনি। কিন্তু নিকাশি ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান হয় না।” যদিও পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাম্প ও জেনারেটর ব্যবহার করে জল নিষ্কাশনের কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রশ্ন উঠছে — তাহলে সারা বছর পুরসভার কোটি কোটি টাকার বাজেট কোথায় যায়? বছরের পর বছর ধরে একই অভিযোগ কেন থেকে যায়?

বহরমপুর পুরসভার বিরোধী দলনেতা হিরু হালদার বলেন, “বহরমপুর পুরসভা পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ — এটা আজ সাধারণ মানুষের কাছেও স্পষ্ট। শহরের প্রায় সর্বত্র রাস্তাঘাট ও নিকাশি ব্যবস্থার অবস্থা শোচনীয়। পুরসভার চেয়ারম্যান কথায় অনেক কিছু বলেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তিনি সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। ২০০০ সালের বন্যার পর ঐতিহাসিক ব্যারাক স্কোয়ারে আর কেউ জল জমে থাকতে দেখেনি। অথচ আজকের দিনে সেখানে মানুষ মাছ ধরছে — এটা নিঃসন্দেহে এক লজ্জাজনক চিত্র এবং পুরসভার অযোগ্যতার নগ্ন প্রমাণ।”

 স্থানীয়দের অভিযোগ বর্ষার আগে নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক করার জন্য পৌরসভা ডেন সংস্কারে নেমে পড়ে। ভেঙ্গে ফেলা হয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার ডেন। কিন্তু এই বছরে বর্ষা সঠিক সময়ে আসাতে সেই কাজ শেষ  করতে পারে নি। যার ফলে এক রাতের বৃষ্টিতেই এই অবস্থা। আর শহর যত বাড়ছে সেই সঙ্গে সঙ্গে পুকুর ভরাট চলছে।

টানা বৃষ্টি ও ড্রেনের জলে জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। রাস্তায় জল জমে থাকার কারণে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ এবং অফিসগামী কর্মীরা চরম হয়রানির শিকার। শুধু তাই নয়, এই জলবন্দি পরিস্থিতিতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের দোকানে জল ঢুকেছে, ব্যবসা বন্ধ রয়েছে এবং তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তাদের ক্ষোভ পৌরসভার বিরুদ্ধে আরও তীব্র হয়েছে। ওই দিনের বৃষ্টিতে রাতের বেলায় এসপি বাংলোর সামনে ভেঙ্গে পরে একটি প্রাচীন গাছ। আজকে ৩ দিন হয়ে গেলেও সেই গাছ এখনো সরানো গেলো না। ফলে ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা যাচ্ছে না । একটা গাছ সরাতে ৩দিন কেন লাগবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

বহরমপুরের এই জলবন্দি পরিস্থিতি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে এক বিশাল ফারাক তুলে ধরেছে। একসময় মুর্শিদাবাদের গর্ব হিসাবে পরিচিত এই শহর আজ সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে। পৌরসভার দায়সারা মনোভাব, রাজনৈতিক চাপান-উতোর এবং নিকাশি ব্যবস্থার অব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বহরমপুরবাসীর দুর্ভোগের যেন কোনো শেষ নেই। স্থানীয়দের এখন একটাই দাবি, ক্ষণস্থায়ী মেরামতের বদলে পৌর প্রশাসন যেন এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করে, যাতে আগামী বছরগুলিতে তাদের আর এই ধরনের দুর্ভোগের শিকার হতে না হয়।

বর্ষা আসবেই, বৃষ্টি হবে — এটা প্রাকৃতিক। কিন্তু শহর জলমগ্ন হবে কিনা, তা নির্ভর করে পুর প্রশাসনের সদিচ্ছা ও পরিকল্পনার উপর। তৃণমূল পরিচালিত বহরমপুর পুরসভার সেই সদিচ্ছার অভাব আজ স্পষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *