অনন্তনাগ বিপর্যয়: নিখোঁজ দুই প্যারা কমান্ডোর দেহ উদ্ধার, শহিদ হলেন মুর্শিদাবাদের পলাশ ঘোষ

চরম তুষারঝড়ে আটকে পড়ে প্রাণ হারালেন দেশের দুই সাহসী সেনা জওয়ান

শ্রীনগর / মুর্শিদাবাদ, ১০ অক্টোবর, ২০২৫:
জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার কোকেরনাগের গাডোল জঙ্গলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সময় নিখোঁজ হওয়া সেনাবাহিনীর দুই এলিট প্যারা (Para SF) কমান্ডোর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চার দিন ধরে তল্লাশি চালানোর পর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (৯–১০ অক্টোবর) সেনাবাহিনীর উদ্ধার অভিযানে তাঁদের নিথর দেহ মিলেছে। এই দুই সাহসী সেনা হলেন ল্যান্স হাবিলদার পলাশ ঘোষ এবং ল্যান্স নায়েক সুজয় ঘোষ। জানা গিয়েছে এদের একজনের বাড়ি মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ায় এবং আরেকজনের বাড়ি বীরভূমে।

সেনা সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর গভীর রাতে অনন্তনাগের আহলান গাডোল এলাকার ঘন জঙ্গলে সন্ত্রাসীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে চিরুনি তল্লাশি অভিযান শুরু করেন সেনা জওয়ানরা।তল্লাশি চলাকালীন হঠাৎই ওই এলাকায় তীব্র তুষারঝড় (Snowstorm) এবং ‘হোয়াইটআউট’ পরিস্থিতি তৈরি হয়, ফলে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। এই প্রতিকূল আবহাওয়াতেই দুই কমান্ডো দলের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন।

সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে সেনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে কোনও জঙ্গি গুলিবিনিময় নয়, বরং চরম তুষারপাত ও হাইপোথার্মিয়া (Hypothermia)-র কারণেই দুই কমান্ডোর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাপমাত্রা আচমকা নেমে যাওয়ায় তাঁরা প্রাণ হারান। সেনা সূত্র আরও জানিয়েছে, এলাকাটি কিশতওয়ার রেঞ্জের অন্তর্গত, যেখানে তাপমাত্রা তখন মাইনাসের নিচে নেমে গিয়েছিল।

নিখোঁজ হওয়ার পরপরই বিশাল উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। সেনা, পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর শতাধিক সদস্য দুর্গম গিরিখাত ও ঘন জঙ্গলে অভিযান চালান।
তল্লাশি অভিযানে ব্যবহার করা হয় ড্রোন, ইউএভি ও হেলিকপ্টার। প্রথমে বৃহস্পতিবার ল্যান্স নায়েক সুজয় ঘোষের দেহ উদ্ধার হয়, এরপর শুক্রবার সকালে ল্যান্স হাবিলদার পলাশ ঘোষের দেহও খুঁজে পাওয়া যায়।

সেনাবাহিনীর চিনার কর্পস (Chinar Corps) এক্স (X) হ্যান্ডেলে পোস্ট করে জানিয়েছে,

“কোকেরনাগের দুর্গম এলাকায় চরম আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে দেশের সেবায় আত্মবলিদান দিয়েছেন ল্যান্স হাবিলদার পলাশ ঘোষ ও ল্যান্স নায়েক সুজয় ঘোষ। তাঁদের বীরত্ব আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।”

শহিদ ল্যান্স হাবিলদার পলাশ ঘোষ মুর্শিদাবাদ জেলার হরিহরপাড়া থানার রুকুনপুর বলরামপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। শুক্রবার তাঁর দেহ উদ্ধার হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে সমগ্র গ্রামে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে শনিবার তাঁর মরদেহ নিজ গ্রামে পৌঁছানোর কথা। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা সবাই অপেক্ষা করছেন শহিদ সন্তানের শেষ যাত্রার জন্য।

পরিবারের এক সদস্য জানায় “সকালে মৃত দেশ উদ্ধার হলেও সেনা থেকে অফিসিয়ালি আজকে সন্ধ্যা বেলায় জানানো হয়েছে। শনিবারে পলাশের দেহ বীর সম্মানের সহিত গ্রামে পৌঁছে দেবে সেনা”

স্থানীয় এক প্রতিবেশী বলেন,

“পলাশ ছোটবেলা থেকেই সাহসী ছিল। দেশের জন্য ওর এই আত্মত্যাগ গোটা গ্রামকে গর্বিত করেছে, আবার একই সঙ্গে ব্যথিতও করেছে।”

উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই একই গাডোল বন এলাকায় জঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষে কর্নেল মনপ্রীত সিং, মেজর আশীষ ধোনচাক-সহ একাধিক সেনা কর্মকর্তা শহিদ হয়েছিলেন। এই এলাকা সন্ত্রাসীদের সক্রিয় উপস্থিতির জন্য সেনাবাহিনীর কাছে দীর্ঘদিন ধরেই “রেড জোন” হিসেবে চিহ্নিত।

পলাশ ঘোষ ও সুজয় ঘোষ— দুই শহিদের এই আত্মত্যাগ আবারও মনে করিয়ে দিল, সীমান্তে শান্তি ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতীয় সেনারা কীভাবে প্রাণপণ লড়াই করে চলেছেন।
তাঁদের বীরত্ব ভারতবর্ষের প্রতিটি নাগরিকের কাছে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


রিপোর্ট: নিউজ ফ্রন্ট ডেস্ক | অনন্তনাগ–মুর্শিদাবাদ সংযোগে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *