নিউজ ফ্রন্ট, কাকদ্বীপ:
উত্তাল সমুদ্রে দিকভ্রষ্ট হয়ে ভিনদেশে বন্দিদশা, দীর্ঘ পাঁচ মাসের অনিশ্চয়তা আর প্রতি মুহূর্তে দেশে ফেরার আকুতি—অবশেষে সমস্ত দুঃস্বপ্নের অবসান। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এবং রাজ্য সরকারের তৎপরতায় বাংলাদেশ থেকে মুক্তি পেয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরলেন কাকদ্বীপের চার মৎস্যজীবী। বুধবার নিজেদের এলাকায় পা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা, একইসঙ্গে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য প্রশাসনের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

গত জুলাই মাসে জীবিকার সন্ধানে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন কাকদ্বীপের এই মৎস্যজীবীরা। কিন্তু ১২ জুলাই আবহাওয়া হঠাৎ প্রতিকূল হয়ে ওঠে। ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারের নিয়ন্ত্রণ হারান তাঁরা। দিকভ্রষ্ট হয়ে অজান্তেই অতিক্রম করে ফেলেন আন্তর্জাতিক জলসীমা। বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে পড়ার অপরাধে সে দেশের কোস্ট গার্ড তাঁদের আটক করে। সেই থেকে শুরু হয় জেলের চার দেওয়ালের বন্দিজীবন।
দেশে ফেরার পর জেলজীবনের বিভীষিকার কথা শোনালেন মৎস্যজীবীরা। উদ্ধার হওয়া মৎস্যজীবী ঝন্টু দাস বলেন, “প্রায় পাঁচ মাস আমরা বন্দি ছিলাম। আমাদের খুব সামান্য খাবার দেওয়া হতো। শোয়ার জন্য জুটত মাত্র একটি কম্বল। আমরা জানতাম না আদৌ আর কোনও দিন দেশে ফিরতে পারব কি না।” আরেক মৎস্যজীবী শেখ ফরিদ বলেন, “আমরা খুব কষ্টের মধ্যে ছিলাম। একরকম আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম যে আর হয়তো পরিবারের মুখ দেখতে পাব না।”

মৎস্যজীবীদের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেফতারের খবর পাওয়ার পরেই তাঁরা স্থানীয় বিধায়ক মন্টুরাম পাখিরার দ্বারস্থ হন। বিধায়ক বিষয়টি দ্রুত সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে আনেন। এরপরই নবান্ন থেকে তৎপরতা শুরু হয়। প্রশাসনিক স্তরে লাগাতার আলোচনার ফলেই অবশেষে তাঁদের মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়।
বাড়ি ফিরে বিশ্বনাথ দাস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা পাঁচ মাস জেলে ছিলাম। আমাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য আমি দিদির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) কাছে ঋণী। ভাবতেই পারিনি যে আমি আবার ফিরে আসতে পারব।” স্বপন দাস কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছিল, রাজ্য সরকার আমাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কাকদ্বীপের বিধায়ক মন্টুরাম পাখিরা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রীর অমূল্য প্রচেষ্টার কারণেই আজ আমরা এখানে ফিরে আসতে পেরেছি।”
উল্লেখ্য ৯ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে মোট ৮৫ জন জেলেকে মুক্তি দিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়। এর মধ্যে ৪৭ জন ভারতীয় এবং ৩৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক।
ঘরের ছেলেরা ঘরে ফেরায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে কাকদ্বীপের মৎস্যজীবী পরিবারগুলি। রাজ্য সরকারের এই মানবিক ভূমিকাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। মৎস্যজীবীদের নিরাপদে ফেরানো যে রাজ্য সরকারের কাছে কতটা অগ্রাধিকারের বিষয় ছিল, এই ঘটনা ফের তা প্রমাণ করল।