বিশেষ প্রতিবেদন, মুর্শিদাবাদ: বাংলার রাজনীতিতে নতুন বছরের শুরুটা হতে চলেছে অত্যন্ত উত্তপ্ত। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের নতুন রণকৌশল সাজিয়ে ফেলেছে। শনিবার ভার্চুয়াল বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলন করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন তাঁর মাসব্যাপী জনসংযোগ কর্মসূচি ‘উন্নয়নের পাঁচালি’। এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে ১৫ বছরের সরকারি কাজের খতিয়ান বা ‘রিপোর্ট কার্ড’ এবং বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিরোধ।
তৃণমূলের এই বিশাল কর্মসূচিতে মুর্শিদাবাদ জেলাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৭ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদে পা রাখবেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওইদিন জেলার দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে তাঁর কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছে সকালেই তিনি জঙ্গিপুরে পৌঁছাবেন। সেখানকার দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা করবেন তিনি। তৃণমূলের ১৫ বছরের উন্নয়ন কীভাবে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে, তা তুলে ধরাই হবে তাঁর লক্ষ্য। জঙ্গিপুর সেরে বিকেলের দিকে তিনি পৌঁছাবেন জেলা সদর বহরমপুরে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বহরমপুর বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুরে তৃণমূলের জয়ের পর এই সফর সাংগঠনিক শক্তিকে আরও সংহত করবে।এমনিতেই ভরতপুরের তৃনমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকে তৃনমূল সাসপেন্ড করার পরে হুমায়ুন নতুন দল করায় এই মুহূর্তে জেলায় কিছুটা চাপে রয়েছে তৃনমূল। মুর্শিদাবাদ যেহেতু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী জেলা, তাই এখানে অভিষেকের সফর ২০২৬-এর নির্বাচনে বড়সড় ইমপ্যাক্ট ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

শনিবার তৃণমূলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন স্লোগান ও লোগো প্রকাশ করা হয়েছে। “যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা।” তৃণমূলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় এজেন্সির বারবার তদন্ত ও রাজনৈতিক আক্রমণের জবাব দিতেই এই স্লোগান বেছে নেওয়া হয়েছে। লোগোতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবির মাধ্যমে দলের সংহতি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ঐক্যবদ্ধ বার্তা দেওয়া হয়েছে। এটি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপির বিরুদ্ধে ‘রাজ্যবাসীর মিলিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
অভিষেক জানিয়েছেন, ১ জানুয়ারি দলের প্রতিষ্ঠা দিবসের পরদিন অর্থাৎ ২ জানুয়ারি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর থেকে এই যাত্রা শুরু হবে। এরপর ৩ জানুয়ারি তিনি যাবেন উত্তরবঙ্গে (আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি)। ৬ জানুয়ারি বীরভূম। ৭-৮ জানুয়ারি: উত্তর দিনাজপুর ও মালদহ। ৯ জানুয়ারি (মতুয়া বেল্ট): এদিন রানাঘাট, কৃষ্ণনগর এবং বনগাঁয় কর্মসূচি। ভোটার তালিকার সংশোধন (SIR) নিয়ে মতুয়াদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করতে এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০ ও ২১ জানুয়ারি: জঙ্গলমহলের বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও বিষ্ণুপুরে দুই দফায় প্রচার। ১২ জানুয়ারি বিবেকানন্দ জয়ন্তীতে কলকাতায় মেগা ইভেন্ট। ১৫ ও ২৪ জানুয়ারি তমলুক ও কাঁথি (অধিকারী গড় হিসেবে পরিচিত এলাকায় বিশেষ নজর)।
২০২৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটের আগে অভিষেক ‘তৃণমূলের নবজোয়ার’ যাত্রা করেছিলেন যা শুরু হয়েছিল উত্তরবঙ্গ থেকে। তবে এবারের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ শুরু হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গ (বারুইপুর) থেকে। অভিষেকের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, এটি গতবারের মতো কেবল জনসংযোগ নয়, বরং ১৫ বছরের কাজের অডিট বা রিপোর্ট কার্ড মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার এক পদ্ধতিগত লড়াই।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “আমরা যদি মাথা নত করি তবে এ রাজ্যের মানুষের কাছে করব। বিজেপির কাছে করব না।” তিনি স্পষ্ট করেছেন, জানুয়ারি মাসজুড়ে তিনি রাস্তায় থাকবেন এবং মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেবেন উন্নয়নের আসল খতিয়ান।