নিউজ ফ্রন্ট | মুর্শিদাবাদ | ২৬ জুন, ২০২৫
দেশের এক পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত ধর্মগুরু ও সমাজসেবক কার্তিক মহারাজের বিরুদ্ধে এবার উঠল ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগকারিণী এক মহিলার দাবি, ২০১৩ সালে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের একটি আশ্রমের স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত করেন কার্তিক মহারাজ। এরপর থেকে শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক দীর্ঘ পর্ব। স্থানীয় এক সংবাদ মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে মুখ খুলেছেন ওই মহিলা।
ওই মহিলার অভিযোগ, আশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পর এক রাতে আচমকাই মহারাজ তাঁর ঘরে এসে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেন। আশ্রয় ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় বাধ্য হয়ে তিনি তা মেনে নিতে বাধ্য হন। ছয় থেকে সাত মাস ধরে চলা এই সম্পর্কের জেরে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং পরে মহারাজের চাপে পড়েই গর্ভপাত করাতে হয় তাঁকে।
কিন্তু এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এতদিন পরে কেন মুখ খুললেন ওই মহিলা? তিনি বলছেন আমি কার্ত্তিক মহারাজকে বলেছিলাম আমাকে পুরনো কাজ টা ফিরিয়ে দিতে বলেছিলাম কিন্তু উনি দিলেন না।
এই ঘটনায় নবগ্রাম থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ওই মহিলা, যা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত সেবাশ্রম সংঘ বেলডাঙ্গার বাসিন্দা কার্তিক মহারাজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু হয়েছে, এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তবে কার্তিক মহারাজ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর গ্রেপ্তারির বিষয়ে পুলিশ এখনও কিছু জানায়নি, তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তদন্ত দ্রুতগতিতে চলছে এবং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হবে।
এদিন কার্ত্তিক মহারাজের গ্রেপ্তারির দাবী নিয়ে নবগ্রামে মিছিল করেন মহিলারা। এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন নবগ্রামের বিধায়ক কানাই চন্দ্র মণ্ডল।তিনি বলেছেন “ কার্ত্তিক মহারাজ হিন্দুত্ব বাদীর স্লোগান তুলে হিন্দুদের নেতা হতে চাইছেন। আমরা তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে অনেক আগে থেকেই জানি। অনেকের সঙ্গেই উনি এই রকম নোংরা কাজ করেছেন আমরা কান পাতলেই নবগ্রামে শুনতে পাই। আজকে একজন মহিলা সাহস করে অভিযোগ করেছে বলে এই হিন্দুবাদী নেতার মুখোশ খুলে গেছে। আমরা এই ব্যাভিচারিতার চরমতম শাস্তি চাই।“
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাঁর মন্তব্য ঘিরে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে তিনি দলের মধ্যে কিছুটা চাপে রয়েছেন বলেই সূত্রের খবর। এখন সেই পুরনো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে গিয়েই কি ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন বিধায়ক? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কার্ত্তিক মহারাজ রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি জোর গুঞ্জন উঠেছে যে, তিনি আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হতে পারেন। এই প্রেক্ষিতেই তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে তাঁকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। কথায় বলে, যখন কাউকে রাজনৈতিকভাবে হারানো সম্ভব হয় না, তখন তাঁর চরিত্রহনন করার চেষ্টা করা হয়।
এর আগেও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির বিরুদ্ধেও একজন মহিলা একই ধরনের অভিযোগ এনেছিলেন, যা পরে প্রমাণিত হয়নি। ২০২৩ সালে সাগরদিঘির তৃণমূল বিধায়ক বাইরন বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ ওঠে, তবে সেই অভিযোগও শেষ পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
ধর্মের আড়ালে এক অসহায় মহিলার শোষণের অভিযোগ ঘিরে জেলাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত এক ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুধুই কোনও ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয় নয়, তা গোটা সমাজের জন্য এক গুরুতর প্রশ্নচিহ্নও বটে। তবে, একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসছে— যদি ওই মহিলার অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তবে সেই মিথ্যা অভিযোগের নেপথ্যে থাকা উদ্দেশ্যই বা কী?