বন্যার মধ্যে বিতর্ক: ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের অগ্রগতি নিয়ে দেবের সাফাই

সংক্ষিপ্ত বিবরণ

আবারও বন্যায় প্লাবিত ঘাটালে মাস্টার প্ল্যান নিয়ে বিজেপির কটাক্ষের জবাবে সাংসদ দেব সোশ্যাল মিডিয়ায় সফাই দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে কাজ শুরুর কথা থাকলেও প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হতে আরও ৪-৫ বছর সময় লাগবে।

বিস্তারিত সংবাদ

নিউজ ফ্রন্ট, ২৫ জুন :  জুন মাসেও আবারও বন্যার কবলে পড়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল। শিলাবতী ও ঝুমি নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলমগ্ন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের তিন তিন বারের স্থানীয় সাংসদ দীপক অধিকারী ওরফে দেবের ওপর চাপ বাড়ছে।

বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতেই বিজেপি নেতারা সাংসদ দেবকে নিশানা করেছেন। বিজেপি বিধায়ক শীতল কপাটের সমর্থকরা তাঁকে ‘ঢপবাজ’ বলে কটাক্ষ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তাদের প্রশ্ন – “ঘাটালের মানুষকে আর কতবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবেন?”

বিজেপির কটাক্ষের জবাবে দেব তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, “বিগত ১০ বছর ধরে লোকসভার সকল অধিবেশনে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের সপক্ষে সওয়াল করে এসেছি। অনেক চেষ্টার পরও কেন্দ্রীয় সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।”তিনি আরও জানিয়েছেন, “২০২৪ সালে রাজ্য সরকারই সিদ্ধান্ত নেয় এবং এক তৃতীয়াংশ বাজেট (৫০০ কোটি) বরাদ্দ করে। ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে কাজ শুরু হয়।”

দেব স্পষ্ট করেছেন যে এই মাস্টার প্ল্যানে রয়েছে ৭৮ কিলোমিটার + ৫২ কিলোমিটার নদীর ড্রেজিং থেকে শুরু করে বাঁধ, ব্রিজ, খাল কাটা, খালের সংস্করণ, কৃত্রিম নদী তৈরি করা এবং জমি অধিগ্রহণ। “যার সময়সীমা কমপক্ষে ৪-৫ বছর,” তিনি উল্লেখ করেছেন।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে সাংসদ বোঝাতে চেয়েছেন যে এমন বিশাল প্রকল্প মাত্র কয়েক মাসে সম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হলেও জুনেই এর ফল দেখা যাবে এমনটা আশা করা অবাস্তব।

৬৫ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা

ঘাটাল মাস্টার প্লান পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল অঞ্চলের বার্ষিক বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা যা ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় রয়েছে। ১৯৫০এর দশকে প্রথমবার সংসদে ঘাটালের বন্যার সমস্যার কথা তোলেন বাম সাংসদ নিকুঞ্জবিহারী চৌধুরী। ১৯৫৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মানসিংহ কমিটি বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে এবং ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের প্রস্তাব দেয়। ১৯৮৩ সালে রাজ্যের তৎকালীন সেচ মন্ত্রী প্রভাস রায় প্রকল্পের শিলন্যাস করেন, কিন্তু তার পর কাজ থমকে যায়। ১৯৯৩ সালে স্থানীয়রা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন।

বিজেপি নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন যে দেব সাংসদ হওয়ার পর থেকে ঘাটালের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। তারা তাঁকে ‘প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চ্যাম্পিয়ন’ কিন্তু ‘কাজের ক্ষেত্রে ঢপবাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে প্রতি বছর একই প্রতিশ্রুতি শুনে তাঁরা ক্লান্ত। বন্যার জল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান দেখছেন না তাঁরা।

দেব তাঁর পোস্টে স্বীকার করেছেন, “ঘাটালে বন্যা হওয়ার পর মানুষের অভিমান যথারীতি জনপ্রতিনিধিদের উপরেই হবে। এই দুর্যোগের সময় সরকার এবং প্রশাসন আপনাদের পাশে সব সময় আছে।”

দাসপুর এলাকার গ্রামবাসীরা নতুন খাল খননের বিরোধিতা করছেন। তাদের আশঙ্কা যে এতে তাদের উর্বর জমি নষ্ট হবে এবং তাদের এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়বে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ একটি বড় বাধা। প্রশাসন জানিয়েছে যে জোর করে কারো জমি নেওয়া হবে না, মালিকদের সম্মতি নিয়েই এগোনো হবে।

কলকাতা হাইকোর্ট এই প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে রিপোর্ট তলব করেছে। প্রধান বিচারপতি টিএস শিবাজ্ঞানম ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, “কবে শেষ হবে কাজ? এ তো কাজ হতে হতে পরের বছরের বন্যা শুরু হয়ে যাবে!”

প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি – প্লাবিত গ্রাম, নৌকায় যাতায়াত, ত্রাণ শিবির। ঘাটালবাসীর জীবনে যেন এসব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ৬৫ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর মানুষ এখনও আশা করে যে এবার হয়তো সত্যিই তাদের দুর্ভোগের অবসান হবে। কিন্তু প্রতি বছর একই পরিস্থিতিতে তাদের হতাশা আরও গভীর হচ্ছে।

ঘাটাল মাস্টার প্লান এখন শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতার একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুনের বন্যা আবারও প্রমাণ করেছে যে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে এখনও বিস্তর ফারাক রয়েছে। দেবের ব্যাখ্যা যতই যুক্তিসঙ্গত হোক, ভেসে যাওয়া ঘাটালবাসীর কাছে তা সান্ত্বনার চেয়ে হতাশাই বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *