নিউজ ফ্রন্ট ডেস্ক | ১৮ মে ২০২৫, মুর্শিদাবাদঃ
উত্তরপ্রদেশের মথুরার গোবিন্দনগর থানায় পাঁচজন বাঙালি যুবককে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে মুর্শিদাবাদে। তবে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের তৎপর হস্তক্ষেপে শেষপর্যন্ত নির্দোষ যুবকদের মুক্তি মিলেছে। এই ঘটনা ফের একবার বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রশ্নে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিল।
গতকাল, ১৭ মে মুর্শিদাবাদ পুলিশ জানতে পারে যে জেলার পাঁচজন যুবক উত্তরপ্রদেশে আটক হয়েছেন। জানা যায়, ওই পাঁচজন—নুর ইসলাম মিয়া, সাইদুল ইসলাম, গোলাম রসুল, রাইহান শেখ ও সোহেল রানা—কাজের সূত্রে মথুরার গোবিন্দনগরে গিয়েছিলেন। সেদিন রাতে নাইট ডিউটির পর স্থানীয় এক পার্কে বিশ্রাম নিতে গিয়ে পুলিশ তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে।
সূত্রের খবর, বাংলায় কথা বলার কারণে স্থানীয় পুলিশের সন্দেহ হয় তারা বাংলাদেশি নাগরিক। তাঁদের বৈধ পরিচয়পত্র তখন সঙ্গে না থাকায় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় গোবিন্দনগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে আটক রাখা হয়।
পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করলে ইসলামপুর থানার আধিকারিক নির্মল দাস বিষয়টি জেলা পুলিশ সুপারকে জানান। দ্রুত মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ উত্তরপ্রদেশ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় সংক্রান্ত সমস্ত বৈধ নথি পাঠানো হয়। নথিপত্র যাচাইয়ের পর মথুরা পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, পাঁচজনই ভারতীয় নাগরিক এবং মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। এরপর গভীর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ছেড়ে দেওয়ার খবর পাওয়ার পরই থানায় ছুটে যান নুর ইসলাম ও সাইদুল ইসলামের আত্মীয়রা। তাঁরা জানান, “আমরা খুবই খুশি। ধন্যবাদ জানাই ইসলামপুর থানার আধিকারিক ও মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশকে। না হলে আমাদের ছেলেরা নির্দোষ হয়েও কতদিন আটক থাকত কে জানে!”
এটা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়ায় ছয়জন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে একইভাবে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তাঁরা মুক্তি পান। এমনকি মথুরা অঞ্চলেই সম্প্রতি ৯০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে অবৈধভাবে বসবাসের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল।
ওড়িশা ও গুজরাট থেকেও এই ধরনের ভয়াবহ ঘটনার খবর এসেছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের উপরে নজরদারি, প্রশ্নাতীত পরিচয় যাচাই ও বেআইনি গ্রেফতারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বহরমপুরের সাংসদ ইউসুফ পাঠান ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এই ধরনের হেনস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছেন। কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরীও ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন।
সম্প্রতি মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সহিংসতায় তিনজনের মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই জেলা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের লক্ষ্য করে দেশবিরোধী তকমা লাগানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
একটি সাধারণ কাজের খোঁজে রাজ্যান্তরে গিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিচয় নিয়ে হয়রানি হওয়া আজ আর নতুন নয়। মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের তৎপরতা ও মানবিক হস্তক্ষেপ প্রশংসনীয় হলেও, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বাঙালি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বৈষম্যমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রয়োজন সর্বস্তরে সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।