ঐতিহ্যের জয়! ‘মুর্শিদাবাদ মহারাজা কৃষ্ণনাথ বিশ্ববিদ্যালয়’—নাম বিতর্কে ইতি টেনে বিধানসভায় বিল পাস

আব্দুল হালিম, বহরমপুর: এক কলমের খোঁচায় হারিয়ে যেতে বসেছিল দেড়শ বছরের পুরনো ইতিহাস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় হলো জনআবেগের। মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নাম হতে চলেছে মুর্শিদাবাদ মহারাজা কৃষ্ণনাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বহরমপুর”। কাসিমবাজার রাজপরিবারের দানবীর রাজা কৃষ্ণনাথের নাম বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল, বিধানসভায় সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে তাতে প্রলেপ পড়ল।

১৮৫৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরি হওয়া কৃষ্ণনাথ কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলার নবজাগরণ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। মাস্টারদা সূর্য সেন থেকে নলিনী বাগচীর মতো বিপ্লবীদের স্মৃতিবিজড়িত এই হেরিটেজ ভবনটি বহরমপুর তথা মুর্শিদাবাদের গর্ব। ২০১৮ সালে মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের মাধ্যমে কলেজের মানোন্নয়ন করা হলেও ব্রাত্য রাখা হয়েছিল রাজা কৃষ্ণনাথের নাম। এমনকি ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে কৃষ্ণনাথ কলেজের অস্তিত্ব পুরোপুরি অবলুপ্ত করে দেওয়া হয়।

এর প্রতিবাদেই দীর্ঘ ৮ বছর ধরে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসছিল কৃষ্ণনাথ কলেজ প্রাক্তনী সংসদ। তাঁদের দাবি ছিল, যাঁর পরিশ্রমে ও দানে এই বিশাল মহীরুহ গড়ে উঠেছিল, সেই রাজা কৃষ্ণনাথের নাম যেন কোনোভাবেই মুছে না যায়।

রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রাক্তনীদের চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। প্রবীণ ইতিহাসবিদ ডঃ বিষাণ কুমার গুপ্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, যে কলেজকে এক কলমের খোঁচায় বিধানসভায় অবলুপ্ত করা হয়েছিল, আজ সেখানেই কৃষ্ণনাথের নাম ফিরে আসা আমাদের কাছে পরম গৌরবের দিন। জেলাবাসীর জয় হলো।”

প্রাক্তনী সংসদের সম্পাদক দেবজ্যোতি বিশ্বাস জানান, নাম পরিবর্তন মানে কেবল অক্ষরের বদল নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই ছিল। ২০১৯ সাল থেকে আমরা কনভেনশন, আন্দোলন ও সরকারের কাছে লাগাতার আবেদন জানিয়ে এসেছি। সরকার দেরিতে হলেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাদের আবেগ ও দাবিকে সম্মান জানিয়েছে।” কার্যকারী সভাপতি হিমাদ্রি নারায়ণ সাহা মনে করিয়ে দেন, এই লড়াই ছিল দীর্ঘ ৮ বছরের। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও কীভাবে জনআবেগকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যায়, এটি তারই প্রমাণ।

নাম পরিবর্তন নিয়ে যখন খুশির হাওয়া তুঙ্গে, ঠিক তখনই শহরবাসীর মনে জেগেছে এক বড় প্রশ্ন—নাম বদল কি শিক্ষার মান ফেরাতে পারবে? ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা হওয়ার পর থেকে পরিকাঠামো ও পঠনপাঠনের উল্লেখযোগ্য উন্নতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। প্রাক্তনীদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন নয়, রাজবাড়ি সংলগ্ন এই চত্বরে যাতে জাতীয় স্তরের গবেষণাগার এবং উন্নত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠক্রম চালু থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে সরকারকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *