নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর ও ফরাক্কা: ফরাক্কার বিডিও অফিসে তাণ্ডব ও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় যখন তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়েরের জন্য নির্বাচন কমিশন সরাসরি নির্দেশ দিয়েছে, ঠিক সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তেই উল্টো সুর শোনা গেল বিধায়কের গলায়। শুক্রবার মহকুমা শাসক (SDO) তথা নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকের (ERO) কাছে একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যাপত্র জমা দিলেন তিনি। চিঠিতে মনিরুল দাবি করেছেন, তাঁর কথা ‘ভুল ব্যাখ্যা’ করা হয়েছে এবং তিনি ভারতের সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।
নির্বাচন কমিশন মুর্শিদাবাদের জেলাশাসককে মনিরুলের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করার নির্দেশ দেওয়ার পরই এই চিঠিটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। চিঠিতে বিধায়ক লিখেছেন তিনি নির্বাচন কমিশন, আইন এবং সংবিধানকে সর্বোচ্চ সম্মান করেন এবং আইনের শাসন মেনে চলেন। গত ১৪ জানুয়ারি ফরাক্কার বিডিও অফিসের সামনে তিনি যা বলেছিলেন, তা নেহাতই ‘মতামত প্রকাশ’ মাত্র। তাঁর বক্তব্যে কোনও প্ররোচনা বা আইনভঙ্গের উদ্দেশ্য ছিল না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তিনি কেবল সেই যন্ত্রণার কথাই তুলে ধরেছেন। মনিরুল লিখেছেন, “আমার শব্দচয়নে যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে বা কেউ ভিন্ন অর্থ করে থাকেন, তবে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। আমি প্রশাসনের সঙ্গে পুরোপুরি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”
উল্লেখ্য, গত ১৪ জানুয়ারি দুপুরে ফরাক্কার বিডিও অফিসে এসআইআর-এর শুনানি চলাকালীন বিধায়ক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল বিক্ষোভকারী অফিসে চড়াও হন। অভিযোগ, অফিসের প্লাস্টিকের চেয়ার ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় এবং সরকারি কর্মীদের হেনস্থা করা হয়। সেই সময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বিধায়ক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন: “রামের নাম শুনলে কোনও নথি লাগছে না, আর রহিমের নাম শুনলেই চোদ্দো গুষ্টির খতিয়ান চাইছেন! নির্বাচন কমিশনের এই দ্বিচারিতা মানব না।” এই মন্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হতেই নির্বাচন কমিশন কড়া অবস্থান নেয়। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারের সঙ্গে কথা বলে কমিশন সাফ জানিয়ে দেয়, এই ধরণের উস্কানি বরদাস্ত করা হবে না।
এই ঘটনার পরেও সম্প্রতি প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে আবার তাকে কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিতে দেখা যায়। তিনি বলেন “লাঠি দিয়ে কোমর ঢিলা করে দিতে হবে। ধুকধুক করে মরার চেয়ে লড়াই করে মরা সার্থক” তিনি আরও বলেন, ১৯ তারিখে সব ঠিক না থাকলে চারিদিকে আগুন জ্বলবে।
নির্বাচন কমিশন গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার মধ্যে মনিরুলের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল জেলা নির্বাচনী আধিকারিক তথা জেলাশাসক নিতিন সিঙ্ঘানিয়াকে। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে ২৪ ঘণ্টা কাটতে চললেও প্রশাসনের তরফে এফআইআর নিয়ে কোনও স্পষ্ট তথ্য জানানো হয়নি। জেলাশাসকও এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেননি। এরই মাঝে মনিরুলের এই ‘ব্যাখ্যাপত্র’ জমা দেওয়া কি আইনি লড়াইয়ের আগাম কৌশল? প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
বর্তমানে পুরো ঘটনার রিপোর্ট চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রশাসনের এই নীরবতা এবং বিধায়কের চিঠির পর জল কোন দিকে গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।