ঝাড়খণ্ডে পরিযায়ী শ্রমিক খুনের অভিযোগে উত্তপ্ত বেলডাঙা

বেলডাঙা | মুর্শিদাবাদ:
ঝাড়খণ্ডে এক পরিযায়ী শ্রমিককে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকাল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা। মৃতদেহ এলাকায় পৌঁছনোর পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। টায়ার জ্বালিয়ে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়, পাশাপাশি শিয়ালদহ–লালগোলা শাখার রেললাইনেও চলে বিক্ষোভ। দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম আলাউদ্দিন শেখ (৩৬)। তিনি ঝাড়খণ্ডের বিশ্রামপুর এলাকায় ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সেখানে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিনরাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এদিন বিস্ফোরণের আকার নেয়।

শুক্রবার সকালে মৃতদেহ বেলডাঙার সুজাপুর এলাকায় পৌঁছতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বেলডাঙা থানার মহেশপুর এলাকায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। পাশাপাশি মহেশপুর আন্ডারপাস সংলগ্ন রেললাইনে বাঁশ ফেলে রেল অবরোধ করা হয়। অবরোধের জেরে লালগোলা–শিয়ালদহ মেমু ও রানাঘাট–লালগোলা মেমু ট্রেন দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে। বহু যাত্রী ট্রেনের মধ্যেই আটকে পড়েন, খাবার ও পানীয় জলের অভাব দেখা দেয়।

ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বচসা বাধে। শাসকদলের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ উগরে দেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রশ্ন, ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকরা আক্রান্ত হলেও কেন তৃণমূলের বিধায়ক বা সাংসদদের কোনও জোরালো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

মৃতের জামাইবাবু উসমান শেখ বলেন, “পরশুদিন আমার শ্যালক ফোন করে জানিয়েছিল, ওখানে ওর আধার কার্ড দেখতে চাওয়া হয়। বলা হয়েছিল, বাংলাদেশি কি না যাচাই করা হবে। বসে বসে কেউ নিজে গলায় দড়ি দিতে পারে না। ওকে খুন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।” মৃতের মা-ও দাবি করেন, ছেলেকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হতো এবং বাড়ি ফিরতে বাধা দেওয়া হচ্ছিল।

এই ঘটনার পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেন, গোটা এলাকা কার্যত গুন্ডা ও দুষ্কৃতীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বিচারে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়েছে, ট্রেন জোর করে আটকে রাখা হয়েছে এবং পুলিশের কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়েনি। তিনি রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত ডিজিপি রাজীব কুমার-এর কাছে পর্যাপ্ত বাহিনী মোতায়েন করে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আবেদন জানান।

বেলডাঙার পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের ভূমিকা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্ফোরক প্রশ্ন তুললেন জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান তথা ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবির। ঝাড়খণ্ডের এই নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, “আর কত প্রাণ গেলে চোখ খুলবে সরকারের? পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? কেন বারবার আমাদের জেলার শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে অকালে প্রাণ হারাতে হবে?”

তিনি অভিযোগ করেন যে, পেটের দায়ে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে আলাউদ্দিন শেখকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ বেলডাঙার জনজীবন স্তব্ধ করে যে স্বতঃস্ফূর্ত অবরোধ পালিত হচ্ছে, তাকে সাধারণ মানুষের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম হিসেবেই দেখছেন তিনি। বিধায়কের স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে দ্রুত সরকারি আর্থিক সাহায্য প্রদান করতে হবে।

অন্যদিকে, ঘটনাস্থলে যান বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ ও প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরী। তিনি ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আবেদন করেন। মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে অধীর বলেন, “ভারতের যেকোনও জায়গায় কাজ করার অধিকার সবার রয়েছে। ভিনরাজ্যে আমাদের শ্রমিকরা কেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন?” তিনি অভিযোগ করেন, এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের তেমন কোনও সক্রিয় ভূমিকা নেই। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন-এর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন বলে জানান অধীর, যদিও মুখ্যমন্ত্রী বিদেশে থাকায় কথা হয়নি।

অধীর আরও বলেন, মুর্শিদাবাদ থেকে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে যান। সেখানে বাংলা ভাষাভাষীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও আক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান, যেসব রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকরা যান সেখানে প্রশাসনিক স্তরে সমন্বয় বাড়ানো হোক এবং শ্রমিকদের সহায়তার জন্য ওয়েলফেয়ার অফিসার নিয়োগ করা হোক।

বেলডাঙার পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যমৃত্যু ও তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা নিয়ে এবার মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঝাড়খণ্ডের এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি সরাসরি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিকে নিশানা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেই বারবার বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা পরিকল্পিতভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। বেলডাঙায় চলা বিক্ষোভের নেপথ্যে কোনো পক্ষ থেকে ‘উস্কানি’ দেওয়া হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ মানুষকে শান্ত হওয়ার বার্তা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের উপর ভরসা রাখুন। পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে সবসময় রাজ্য সরকার রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার সঠিক বিচার করা হবে।”

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চলছে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা পেরিয়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে এই ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়ল মুর্শিদাবাদ জুড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *