ফরাক্কায় বিডিও অফিসে তৃণমূল বিধায়কের উপস্থিতিতে ‘তাণ্ডব’!

ভোটার তালিকায় ‘বৈষম্যের’ অভিযোগে রণক্ষেত্র মুর্শিদাবাদ

নিজস্ব প্রতিনিধি, ফরাক্কা ও বহরমপুর: ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়াল মুর্শিদাবাদ জেলাজুড়ে। বুধবার দুপুরে ফরাক্কার তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে বিডিও অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও সরকারি আধিকারিকদের হেনস্থা করার অভিযোগ উঠল শাসকদলের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় একজন নির্বাচন আধিকারিক (AERO) গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে দিল্লির নির্বাচন কমিশন সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে।

বুধবার দুপুর ১টা নাগাদ ফরাক্কার বিধায়ক মনিরুল ইসলাম কয়েক’শ সমর্থক নিয়ে বিডিও অফিসে চড়াও হন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকায় নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক আচরণ করা হচ্ছে। বিধায়ক ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, এসআইআর-এর নামে রাম আর রহিমের মধ্যে বিবাদ বাঁধানো হচ্ছে। কারো নাম ‘রাম’ শুনলে কোনও নথি চাওয়া হচ্ছে না, কিন্তু ‘রহিম’ নাম হলেই চোদ্দো গুষ্টির খতিয়ান চাওয়া হচ্ছে। এই বৈষম্য আমরা মানব না। ফরাক্কার মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে যদি গুলি খেতে হয়, তবে মনিরুল ইসলাম আগে গুলি খাবে।”

এর পরেই বিক্ষোভকারীরা বিডিও অফিসের ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব শুরু করে। অফিসের চেয়ার-টেবিল লাথি মেরে ভেঙে দেওয়া হয়, লণ্ডভণ্ড করা হয় জরুরি নথিপত্র। সেই সময় নির্বাচনী শুনানি চলায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে। উত্তেজনার জেরে শুনানি প্রক্রিয়া মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়।

এই ঘটনার সমান্তরালে, ফরাক্কা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় ২০০ জন বুথ লেভেল অফিসার (BLO) নির্বাচন কমিশনের ‘অযৌক্তিক’ কাজের চাপ এবং মানসিক যন্ত্রণার অভিযোগ তুলে গণ ইস্তফাপত্র জমা দেন। তাঁদের দাবি, দিনরাত এক করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যা কার্যত অসম্ভব।

ফরাক্কার ঘটনার আঁচ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জেলার অন্যান্য প্রান্তেও। বেলডাঙা ১ বিডিও অফিসেও এদিন প্রায় ২০০ জন বিএলও ইস্তফা দেন।   বেলডাঙা ও রেজিনগরের তৃণমূল বিধায়ক মহম্মদ হাসানুজ্জামান ও রবিউল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিডিও অফিসের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। এর জেরে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যান চলাচল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র‍্যাফ (RAF) মোতায়েন করা হয়েছে।

সরকারি অফিসে হামলা ও আধিকারিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, রাজ্য পুলিশের ডিজির সঙ্গে ফোনে কথা বলে অবিলম্বে এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফরাক্কার বিডিও বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ৩২৯(৪), ২২১, ১৩২, ৩২৪(৩), ১১৫(২) এবং ৩(৫) ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। এছাড়া সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস প্রতিরোধ আইনেও (PDPP Act) মামলা করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধেই এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেফতার করেছে।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন মুর্শিদাবাদের বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ। তিনি বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করার অধিকার কে দিল মনিরুল ইসলামকে? এরা কি নিজেদের বাংলাদেশী ভাবছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই রাজ্যজুড়ে দাঙ্গা ও অরাজকতা চলছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে সাধারণ মানুষ এই তাণ্ডবের যোগ্য জবাব দেবেন।”

অন্যদিকে, বিধায়ক মনিরুল ইসলাম ভাঙচুরের দায় অস্বীকার করে দাবি করেছেন, “আমি এসে ভাংচুর কন্ট্রোল করেছি, আমি বুঝিয়েছি এটা আমাদের সম্পদ আছে নাহলে আরও বেশি ক্ষতি হত” কিন্তু বিরোধী দলের দাবি, বিধায়কের উপস্থিতিতেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।

মুর্শিদাবাদ জেলার এই ঘটনায় প্রশাসন ও রাজনীতির অন্দরমহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তদন্তে কোনওরকম শিথিলতা দেখালে তারা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে হস্তক্ষেপ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *