নবগ্রামে শিশু খুনের ৪ দিন পার: রহস্যের কিনারা করতে ব্যর্থ পুলিশ, তীব্র ‘জনরোষের’ হুঁশিয়ারি রাজনীতিবিদদের

নিজস্ব প্রতিনিধি, নবগ্রাম: মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের রঘুপুর গ্রামে ৬ বছরের এক শিশু কন্যার নৃশংস মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর গত বৃহস্পতিবার রেললাইনের ধার থেকে দেহ উদ্ধার হলেও, ৪ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর এখনো পর্যন্ত এই ঘটনার কোনো স্পষ্ট কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এই ঘটনায় যেমন কান্নায় ভেঙে পড়েছে রঘুপুর গ্রাম, তেমনই চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। এই ইস্যু নিয়ে এবার জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।

গত বুধবার নবগ্রামের রঘুপুর গ্রামের বাসিন্দা হাসান শেখের ৬ বছরের শিশুকন্যা বাড়ির গলি থেকেই হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে নবগ্রাম থানায় নিখোঁজের ডায়েরি করা হলেও ২৪ ঘণ্টা তার কোনো হদিশ মেলেনি। অবশেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়ি থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে বেলুন সংলগ্ন রেললাইনের ধারে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার হয়।

শুক্রবার বিকেলে ময়নাতদন্তের পর কফিনবন্দি হয়ে ছোট্ট মেয়েটি যখন গ্রামে ফেরে, তখন গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সন্ধ্যায় দাফন সম্পন্ন হলেও গ্রামবাসীর মনে দানা বেঁধেছে চরম ক্ষোভ। মৃত শিশুর মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার মেয়েকে খুব কষ্ট দিয়ে মেরেছে। আমি বিচার চাই—দোষীদের ফাঁসি চাই।”

পুলিশ সূত্রে খবর, এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। তবে কেন ওই শিশুটিকে ৬ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হলো এবং মৃত্যুর আসল কারণ কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। পুলিশের দাবি, তদন্ত জোরকদমে চলছে এবং খুব শীঘ্রই প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তবে শনিবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

জেলা পুলিশ সুপার (SP) কুমার সানি রাজ বলেন “আমরা ঘটনার সবকটি দিক খতিয়ে দেখছি। পুলিশ মৃত শিশুর পরিবারের পাশাপাশি চিকিৎসকদের সঙ্গেও নিরন্তর যোগাযোগ রেখে চলেছে। ইতিমধ্যেই কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। কয়েকটি তথ্য যাচাই করার কাজ চলছে, তা সম্পন্ন হলেই খুব দ্রুত সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে।”

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষই সরব হয়েছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হেভিওয়েট নেতারা।

বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ বিষয়টিকে ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, একটি ছোট্ট শিশু আপনার রাজ্যে খুন হয়ে গেল অথচ পুলিশের মাথাব্যথা নেই কেন? আমি আগামীকাল সশরীরে ওই পরিবারটির সঙ্গে দেখা করতে যাব।” তিনি অভিযোগ করেন যে, উপযুক্ত প্রমাণের অভাব বা অন্য কোনো কারণে পুলিশ আসল রহস্য উদঘাটনে গড়িমসি করছে।

ভরতপুরের বিধায়ক তথা জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান প্রশাসনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রশাসন শক্ত না হলে নেপাল বা বাংলাদেশের মতো জনরোষ তৈরি হবে। মানুষ রূপী শয়তানদের রুখতে প্রশাসন ব্যর্থ হলে জনগণ আইন হাতে নেবে এবং তখন সরকার খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

সিপিআইএমের জেলা সম্পাদক জামির মোল্লা দাবি করেছেন রাজ্যে সমাজবিরোধীদের রাজত্ব চলছে। অন্যদিকে, জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি কামাল হোসেন দাবি করেছেন, দ্রুত সত্য জনসমক্ষে আনা হোক যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পায় এবং প্রকৃত দোষী রেহাই না পায়।

এই নৃশংস ঘটনার পর নবগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় চরম ভীতি ছড়িয়েছে। অভিভাবকরা সন্তানদের বাড়ির বাইরে খেলতে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেকেরই প্রশ্ন, ঘরের দোরগোড়া থেকে কীভাবে একটি শিশু উধাও হয়ে যাচ্ছে? নিরাপত্তার এই অভাব সাধারণ মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে।

সোমবার প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরী ওই গ্রামে পৌঁছে পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন বলে জানা গেছে। ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও খুনিরা কেন জেলের বাইরে, সেই প্রশ্ন নিয়ে এখন উত্তাল গোটা নবগ্রাম। জেলা পুলিশ প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে এই ঘটনার দ্রুত কিনারা করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *