ওড়িশায় ফের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে বাঙালি শ্রমিককে পিটিয়ে খুন!

মুর্শিদাবাদের সুতিতে শোকের ছায়া, সরব রাজ্য সরকার

নিউজ ফ্রন্ট, বহরমপুর:

বিজেপিশাসিত ওড়িশায় ফের ‘মব লিঞ্চিং’-এর বলি বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক। বাংলাদেশি সন্দেহে মুর্শিদাবাদের এক যুবককে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল একদল দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার রাতে ওড়িশার সম্বলপুর জেলায়। মৃত শ্রমিকের নাম জুয়েল রানা (২১), তিনি মুর্শিদাবাদের সুতি-১ ব্লকের চক বাহাদুরপুর এলাকার বাসিন্দা। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে আরও দুই বাঙালি শ্রমিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অপরাধ শুধু ‘বাংলায় কথা বলা’?

স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজমিস্ত্রির কাজে গত ২০ তারিখ ওড়িশার সম্বলপুরে গিয়েছিলেন জুয়েল ও তাঁর সঙ্গীরা। বুধবার রাত সাড়ে আটটা নাগাদ জুয়েল সম্বলপুরের একটি চায়ের দোকানে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও দুই শ্রমিক—আরিক শেখ ও পলাশ শেখ। তাঁরা নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলছিলেন।

অভিযোগ, সেই সময় ৫ জন দুষ্কৃতী সেখানে এসে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে গালিগালাজ শুরু করে। শ্রমিকরা তাঁদের বৈধ ভারতীয় পরিচয়পত্র (Aadhaar/Voter ID) দেখালেও দুষ্কৃতীরা তা মানতে চায়নি। এরপরই শুরু হয় বেধড়ক মারধর। আরিক ও পলাশ প্রাণভয়ে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচলেও, জুয়েলকে ধরে ফেলে উন্মত্ত জনতা। রাস্তায় ফেলে তাঁকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জুয়েলকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

মৃতের মা নাজেমা বিবি

মাত্র পাঁচ দিন আগে বাড়ি থেকে উপার্জনের আশায় ওড়িশা গিয়েছিলেন জুয়েল। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা ছাড়াও রয়েছে দুই বোন। পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন এই যুবক। তাঁর অকাল মৃত্যুর খবরে চক বাহাদুরপুর গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আত্মীয়-স্বজনেরা। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ভিন রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের নিরাপত্তা এখন তলানিতে।

এই ঘটনা নিয়ে ওড়িশার বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের মন্ত্রী আখরুজ্জামান বলেন, “ডবল ইঞ্জিন সরকার ওড়িশায় বাঙালি মুসলিমদের টার্গেট করছে। বিজেপি স্পষ্টতই বাংলা এবং বাঙালি মুসলিম বিরোধী। রাজমিস্ত্রির কাজে যাওয়া যুবকদের পিটিয়ে মারা হচ্ছে, অথচ নিরাপত্তা নেই।”

মন্ত্রী শশী পাঁজা কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমরা পরিবারের পাশে রয়েছি, কিন্তু যে প্রাণটি চলে গেল, তার দায় কে নেবে? বিজেপি জবাব দিক কেন বারবার বাঙালিদের ওপর এই আক্রমণ হচ্ছে।”

জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তথা জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি নিহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং আহত দু’জনের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। পাশাপাশি তিনি আশ্বাস দেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে তিনি এবং তাঁর দল সব সময় থাকবে। খলিলুর রহমান আরও জানান, আসন্ন বাজেট অধিবেশনে এই ঘটনাকে সামনে রেখে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিজেপি-বিরোধী সাংসদদের সঙ্গে নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হবে। তাঁর কথায়, এই ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সে জন্য সংসদে জোরালোভাবে বিষয়টি তোলা হবে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।

ঘটনার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালেই মৃত জুয়েল রানার বাড়িতে পৌঁছান সুতির বিধায়ক ঈমানী বিশ্বাস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সুতি থানার আইসি সুপ্রিয় রঞ্জন মাঝি এবং সুতি-১ ব্লকের বিডিও। বিধায়ক পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার জন্য সবরকম আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”

সম্বলপুর থানার পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ওড়িশা পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আহত দুই শ্রমিক আরিক ও পলাশ বর্তমানে হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

একের পর এক বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ দেগে দিয়ে হেনস্তা বা খুনের ঘটনায় পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। মুর্শিদাবাদের এই যুবকের মৃত্যু আবারও ভিন রাজ্যে কাজের খোঁজে যাওয়া মানুষের অনিশ্চিত জীবনের ছবিটা স্পষ্ট করে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *