বাবরি আবেগকে হাতিয়ার করে ওয়াইসির সঙ্গে জোটের জল্পনা, টার্গেট ১৩৫ আসন
বহরমপুর, ৮ ডিসেম্বর:
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় ‘বাবরি মসজিদের’ আদলে মসজিদ তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আরও বড় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ঘোষণা করলেন ভরতপুরের সাসপেন্ড হওয়া তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। রবিবার বহরমপুরে নিজের বাসভবনে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানালেন, খুব শীঘ্রই বেলডাঙায় ১ লক্ষ মুসলিম মৌলবীকে নিয়ে তিনি একটি বিশাল কোরান পাঠ ও ভোজের আয়োজন করতে চলেছেন। একইসঙ্গে আসন্ন নির্বাচনে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল AIMIM-এর সঙ্গে জোট বেঁধে রাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপিকে রুখে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিলেন তিনি।
রবিবার কলকাতায় হিন্দু সংগঠনের আয়োজনে এবং আরএসএস-ঘনিষ্ঠদের উপস্থিতিতে গীতাপাঠ কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনেই নিজের পরিকল্পনার কথা জানান হুমায়ুন। তিনি বলেন “আমি সব ধর্মকেই সম্মান করি এবং গীতাপাঠ নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে আমি বেলডাঙায় দিনব্যাপী কোরান পাঠের আয়োজন করব, যেখানে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা থাকবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর কোরান পাঠের এই ঘোষণা হুমায়ুনের সংখ্যালঘু মেরুকরণের রাজনীতিকে আরও তীব্র করার কৌশল।
তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়ার পর আগামী ২২ ডিসেম্বর নিজের নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করতে চলেছেন হুমায়ুন কবীর। এদিন তিনি স্পষ্ট জানান, রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনে তিনি AIMIM প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসির সঙ্গে জোট গড়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন
“আমি আসাদউদ্দিন ওয়াইসির সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে তাঁর দলে যোগ দিতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি তা গ্রহণ করিনি। তবে জানুয়ারি মাসে হায়দ্রাবাদ গিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে জোট নিয়ে কথা বলব। তিনি বাংলায় আসবেন। আমরা রাজ্যে ১৩৫টি আসনে প্রার্থী দেব।” হুমায়ুনের সাফ কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হতে দেবেন না তিনি। তাঁর দাবি, “তৃণমূলের মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক শেষ হয়ে যাবে। আমি আমার সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারব না।”
শনিবার রেজিনগরে হুমায়ুনের মসজিদ প্রকল্পের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভিড় রাজনৈতিক মহলে চমক সৃষ্টি করেছে। পুলিশ সূত্রের খবর, প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছিল, যদিও হুমায়ুনের দাবি সংখ্যাটা ৪ লক্ষেরও বেশি।
নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ, এমনকি তৃণমূল কর্মীরাও দলের নির্দেশ উপেক্ষা করে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। হুমায়ুন অভিযোগ করেন, পুলিশ ও তৃণমূল প্রশাসন বাধা না দিলে জনসমাগম আরও বাড়ত। যদিও তৃণমূল জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার দাবি করেন, পুলিশ কাউকে বাধা দেয়নি এবং অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছে।
হুমায়ুনের এই উত্থানকে তৃণমূলেরই ‘সাজানো নাটক’ বলে কটাক্ষ করেছে বিজেপি।
জেলা বিজেপি নেতা শাখারভ সরকার বলেন “হুমায়ুন কবীরকে সাসপেন্ড করা হলেও তিনি এখনও তৃণমূলেরই লোক। শো-কজ না করেই সাসপেন্ড করা হলো কেন? আসলে সংখ্যালঘুদের মন পেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই হুমায়ুনকে দিয়ে এই নাটক করাচ্ছেন।”
কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন “হিন্দু ভোট ভাগ ও মুসলিম ভোট এক করার চক্রান্ত চলছে। এর জন্য দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি বরাবর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন।”
নতুন দল গড়লেও এখনই বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেবেন না হুমায়ুন কবীর। যদি তিনি ৪ তারিখে বলেছিলেন তিনি দল ছাড়ার পরে বিধায়ক পদ থেকেও ইস্তফা দিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে তাঁর যুক্তি, “প্রতিদিন বহু মানুষ, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধার জন্য আমার সই নিতে আসে। তাঁদের কথা ভেবেই আমি পদ ছাড়ছি না।”
একইসঙ্গে তিনি তৃণমূলের শীর্ষ নেতা ফিরহাদ হাকিম ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। হুমায়ুন কবীর অভিযোগ করেন, ববি হাকিম তাঁকে সাসপেন্ড করার সময় বাম পাশে নিয়ামত শেখ এবং ডান পাশে মন্ত্রী আখরুজ্জামানকে বসিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, “আমার বাড়ি রেজিনগরে, তো বেলডাঙাতে কেন মসজিদ করছি?” এই ব্যক্তিগত আক্রমণের পাল্টা দিতে হুমায়ুন কবীর চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন “যাকে বাঁ পাশে রেখে আমাকে সাসপেন্ড করেছিল, ২২ তারিখের পরে সে কোথায় থাকে দেখাব!”
বাবরি মসজিদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে হুমায়ুন কবীর যেভাবে মুর্শিদাবাদে নিজের জমি শক্ত করছেন, তা শাসকদলের কাছে এখন বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।