টাকা গুনতে আনা হলো মেশিন! বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের অনুদান ছাড়াল কোটি, সাসপেন্ড হয়েও ‘শক্তির আস্ফালন’ হুমায়ুনের

নিজস্ব সংবাদদাতা, রেজিনগর:

তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন, কিন্তু দমে যাননি ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। বরং মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় প্রস্তাবিত ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণের ডাক দিয়ে কার্যত টাকার পাহাড়ে বসে রয়েছেন তিনি। ঘরের মেঝেতে ঢালা হচ্ছে ট্রাঙ্ক ভর্তি টাকা, আর তা গুনতে হিমশিম খাচ্ছেন ৩০ জন মানুষ। শেষমেশ নোট গোনার জন্য নিয়ে আসতে হয়েছে বিশেষ মেশিন। রবিবার রাত পর্যন্ত মাত্র চারটি ট্রাঙ্ক ও একটি বস্তা খুলে যে পরিমাণ অর্থ এবং অনলাইনে যা অনুদান মিলেছে, তা ইতিমধ্যেই কোটি টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে।

হুমায়ুন কবীরের রেজিনগরের বাড়িতে রবিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুরু হয় এই বিপুল অর্থ গণনার কাজ। ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়া’-র তত্ত্বাবধানে এবং আলেম-উলেমাদের উপস্থিতিতে এই গণনা চলে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ফেসবুকে লাইভ করেও টাকা গোনার দৃশ্য দেখানো হয়।

বিধায়ক সূত্রে খবর, মোট ১১টি স্টেনলেস স্টিলের দানবাক্স বা ট্রাঙ্ক ছিল। রবিবার রাত ১২টা পর্যন্ত মাত্র ৪টি ট্রাঙ্ক এবং একটি বস্তার টাকা গোনা সম্ভব হয়েছে। শুধু নগদেই মিলেছে প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকা (৩৭ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা)। বিধায়কের দাবি, কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে অনলাইনে জমা পড়েছে ৯৩ লক্ষ টাকা। প্রাথমিক হিসেবেই অনুদানের পরিমাণ ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।

বাকি ৭টি ট্রাঙ্কের গণনা সোমবার বিকেল থেকে ফের শুরু হবে। হুমায়ুন ঘনিষ্ঠদের দাবি, বিদেশ থেকেও প্রচুর মানুষ অনুদান পাঠাচ্ছেন। টাকার অঙ্ক কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই বিপুল অর্থ সংরক্ষণের জন্য সিসিটিভি ও কড়া নিরাপত্তা বেষ্টিত একটি পৃথক ঘরের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

গত ৬ ডিসেম্বর, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিনেই বেলডাঙায় এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন হুমায়ুন। সেই অনুষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের জন্য শাহী বিরিয়ানির এলাহি আয়োজন করেছিলেন তিনি। জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি হুঙ্কার দিয়েছিলেন, “টাকার অভাব হবে না।” জানা গেছে, ওইদিনই সভাস্থলে রাখা ১১টি দানবাক্সে মুক্তহস্তে দান করেন আগত মানুষজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি একাই ৮০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেও দাবি বিধায়কের। মসজিদটি তৈরি করতে আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে।

এই মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা এবং বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে তৃণমূল কংগ্রেস হুমায়ুন কবীরকে সাসপেন্ড করেছে। দলের পক্ষ থেকে ফিরহাদ হাকিম কটাক্ষ করে বলেছেন, বিজেপির সঙ্গে ‘সেটিং’ করেই হুমায়ুন এসব করছেন। বিজেপি এবং কংগ্রেসও এই মেরুকরণের রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। কিন্তু সাসপেন্ড হওয়ার পর হুমায়ুন আরও আক্রমণাত্মক। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ২২ ডিসেম্বর তিনি নতুন দল গড়ার কথা ঘোষণা করবেন এবং ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ১৩৫টি আসনে প্রার্থী দেবেন।

রবিবার রাতে টাকার স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে হুমায়ুন যেন বুঝিয়ে দিলেন, প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাঁর এই ‘বাবরি মিশন’ আটকানো যাবে না। ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে মুর্শিদাবাদের মাটিতে এই মসজিদ নির্মাণ যে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যু হতে চলেছে, তা অনুদানের বহর দেখেই স্পষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *