নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর | ২৬ নভেম্বর ২০২৫
প্রদীপ প্রজ্বলন করে শুরু হলো গ্রামীণ কুটির শিল্পের উৎসব, কিন্তু শুরুতেই তা হারিয়ে গেল চরম রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে। বুধবার বহরমপুর ব্যারাক স্কোয়ার ময়দানে ‘মুর্শিদাবাদ জেলা খাদি মেলা’-র উদ্বোধন হয়। কিন্তু মেলার জাঁকজমকের চেয়েও বড় হয়ে উঠল সরকারি প্রোটোকল ও সৌজন্যের অভাবের অভিযোগ। অভিযোগ, সরকারি অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিজেপি বিধায়কদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, অথচ নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বর্তমানে জেলবন্দি তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার নাম জ্বলজ্বল করছে মেলার সরকারি আমন্ত্রণপত্রে।
বুধবার রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ মেলার উদ্বোধন করেন। কিন্তু ফ্লেক্স এবং আমন্ত্রণপত্র প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে যায় জেলা রাজনীতিতে। দেখা যায়, আমন্ত্রণপত্রের অতিথি তালিকায় নাম রয়েছে বড়ঞার তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার। যিনি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়ে গত কয়েক মাস ধরে জেলবন্দি। অথচ, খোদ বহরমপুর এবং মুর্শিদাবাদ বিধানসভার দুই বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র এবং গৌরীশঙ্কর ঘোষের নাম আমন্ত্রণপত্রে নেই। সরকারি প্রোটোকল অনুযায়ী স্থানীয় বিধায়কদের নাম থাকার কথা থাকলেও তাঁদের কার্যত ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।

এই ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, “ডাকাত, চোর, ধর্ষণকারী, বালি ও কয়লা মাফিয়া—এদের নামই তো থাকবে। যারা জেলে বসে ১৫ লাখ টাকা আদানপ্রদান করে চাকরি দেবে বলে, তাদের নাম থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছিলেন। আমরা যখন ৭৭ জন জিতে বিধানসভায় গিয়েছিলাম, তখন থেকেই আমাদের ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চলছে। ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের কোনো উন্নয়নমূলক মিটিংয়ে বা প্রকল্পে ডাকা হয় না। কারণ, ওখানে গেলে আমরা ওদের মুখোশ খুলে দেব। তাই উচ্চপদস্থ অফিসাররাও আমাদের ডাকার সাহস পান না।”
তিনি আরও কটাক্ষ করে বলেন, “খাদি মেলা হচ্ছে, এটা আনন্দের বিষয়। খাদি কেন্দ্রীয় প্রকল্প হলেও রাজ্য সরকার তা পরিচালনা করছে। মানুষ খাদির কাপড় কিনবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মঞ্চে বসে যখন চোর নেতারা খাদির মাহাত্ম্য নিয়ে ভাষণ দেবে, তখন সেটা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।”

অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের বিজেপি বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেন, “আমার সাড়ে চার বছরের বিধায়ক জীবনে কোনো প্রশাসনিক বৈঠকে আমাকে ডাকা হয়নি। এর আগে বেড়া উৎসবেও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এটা তৃণমূলের জন্মগত দোষ। এই সরকার সৌজন্যের রাজনীতি জানে না। একজন জেলবন্দি আসামিকে সম্মান জানানো হচ্ছে, অথচ জনপ্রতিনিধিদের অপমান করা হচ্ছে।”
বিতর্কের মুখে পড়ে সাফাই গাইতে হয়েছে আয়োজকদের। পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের মুর্শিদাবাদ জেলা আধিকারিক দেবর্ষি রায় দাবি করেন, “আমরা সমস্ত বিধায়কদেরই আমন্ত্রণ জানিয়েছি। জীবনকৃষ্ণ সাহার নামও রয়েছে কারণ তাঁর বিধায়ক পদ এখনও খারিজ হয়নি। আমরা তৃণমূল বা বিজেপি দেখে কোনো পক্ষপাতিত্ব করি না।”
যদিও জেলাশাসক নীতিন সিংহানিয়া গোটা বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আমার এ বিষয়ে কিছু জানা নেই।” অন্যদিকে, তৃণমূলের বহরমপুর-মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যান নিয়ামত শেখও বিষয়টি নিয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বিতর্কের আবহেই বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এবারের মেলায় ১৬৯টি স্টল বসেছে। খাদি বস্ত্র ও গ্রামীণ শিল্পদ্রব্যের পসার সাজিয়ে বসেছেন শিল্পীরা। কেনাকাটার পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন।
তবে মেলার আলো ঝলমলে পরিবেশের মধ্যেও জেলবন্দি বিধায়কের নাম থাকা এবং বিরোধী বিধায়কদের বাদ পড়া নিয়ে যে রাজনৈতিক তরজা শুরু হলো, তা সহজে থামার নয় বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।