নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর: শীতের আমেজ গায়ে মাখতেই উৎসবের মেজাজে সেজে উঠল ঐতিহাসিক বহরমপুর। বুধবার বিকেলে ব্যারাক স্কোয়ার ময়দানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও মহাত্মা গান্ধীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদানের মধ্য দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সূচনা হলো দশম ‘মুর্শিদাবাদ জেলা খাদি মেলা ২০২৫’-এর। পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলা চলবে আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী জিআই (GI) ট্যাগ প্রাপ্ত মসলিন, তসর, গরদ ও কোরিয়াল শাড়ি তো আছেই, তার সঙ্গে রয়েছে দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনার খাদির পোশাক। শীতের কথা মাথায় রেখে কাশ্মীর ও ঝাড়খণ্ড থেকে আসা ব্যবসায়ীরা পশরা সাজিয়েছেন লেদারের জ্যাকেট, কাশ্মীরি শাল, সোয়েটার ও উলের পোশাকের।
এবারের খাদি মেলা যেন এক টুকরো মিনি পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের ১৩টি জেলা ছাড়াও ভিন রাজ্য থেকে আসা শিল্পীদের হাতের জাদুতে সেজে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ। মোট ১৬৯টি স্টলে সম্ভারের বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো।
উত্তরবঙ্গের বাঁশ ও বেতের কাজ, কোচবিহারের বিখ্যাত শীতলপাটি, পূর্ব মেদিনীপুরের এগরার মশনদ, এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের শিং-এর তৈরি শিল্পকর্ম মেলায় বিশেষ নজর কাড়ছে। এছাড়াও রয়েছে মুর্শিদাবাদের নিজস্ব পাটের হস্তশিল্প, পটশিল্প এবং মাদুর কাঠির কাজ।

বুধবার মেলা প্রাঙ্গণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল চাঁদের হাটের মতো। মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং বস্ত্র দপ্তরের মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী আখরুজ্জামান, মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান, মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের সভাধিপতি রুবিয়া সুলতানা, জেলাশাসক নীতিন সিঙ্ঘানিয়া, পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ এবং খাদি বোর্ডের চেয়ারম্যান কল্লোল খাঁ সহ একাধিক বিধায়ক ও প্রশাসনিক কর্তারা।
যদিও এদিন বিকেলে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে অনুষ্ঠান শুরু হয়, তবে ঢাকের বোলে ও উদ্বোধনী সঙ্গীতে সেই তাল কেটে যায় দ্রুতই। মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা বলেন, “একসময় খাদি বোর্ড ধুঁকছিল, কিন্তু এখন তা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত বছর এই মেলায় ২ কোটি ৮১ লক্ষ টাকার বেচাকেনা হয়েছিল। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং খাদির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ায় আমাদের লক্ষ্য ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার ব্যবসা।”
খাদি বললেই মনে পড়ে মহাত্মা গান্ধীর চরকা। মেলায় আসা নতুন প্রজন্ম যাতে খাদির ইতিহাস জানতে পারে, তার জন্য চরকায় সুতো কাটার সরাসরি প্রদর্শনী বা লাইভ ডেমোনস্ট্রেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

খাদি গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের বহরমপুর অফিসের তরফে জানানো হয়েছে, সরকারি খাদি বিপণিতে ৩০০০ টাকার কেনাকাটায় মিলবে ৩০০ টাকার নিশ্চিত উপহার সামগ্রী।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে বাউল সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আগামী ৭ ডিসেম্বর দুপুরে শিশুদের জন্য অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও শিশুদের জন্য রয়েছে বিশেষ ‘চিলড্রেন প্লেয়িং গ্রাউন্ড’।
মেলা চলবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় প্রবেশ সম্পূর্ণ অবাধ, কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। কেনাকাটার ফাঁকে রসনা তৃপ্তির জন্য মেলা প্রাঙ্গণে রয়েছে গরম জিলিপি সহ নানা ধরনের খাবারের স্টল।
জেলাশাসক নীতিন সিঙ্ঘানিয়া বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আয়োজিত এই মেলা গ্রামীণ শিল্পীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। সারা বছর ধরে শিল্পীরা এই মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আশা করি, এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে না।”
সন্ধ্যার আলোয় ঝলমলে ব্যারাক স্কোয়ারে এখন সাজানো স্টল, মুক্ত হাট আর গ্রামীণ কুটির শিল্পের সমাহারে জমজমাট পরিবেশ। শীতের সন্ধ্যায় পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য বহরমপুরবাসীর কাছে এই কদিন খাদি মেলাই সেরা গন্তব্য।