বহরমপুরে বিস্ফোরক বিরোধী অভিযান: উদ্ধার দুই কেজি ‘অ্যান্টিমনি ট্রাইসালফাইড’

বহরমপুর, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫। নিউজ ফ্রন্ট:

গোপন সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর সংলগ্ন রাণীনগর গ্রামে বড়সড় অভিযান চালিয়েছে বহরমপুর থানার পুলিশ। রবিবার রাতে সাইদুল শেখ নামে এক অভিযুক্তের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় দুই কেজি পরিমাণ নিষিদ্ধ বিস্ফোরক রাসায়নিক ‘অ্যান্টিমনি ট্রাইসালফাইড’ (Sb2S3) উদ্ধার করা হয়েছে। এটি বোমা ও অন্যান্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক তৈরির অন্যতম মূল উপাদান, যা মজুত রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এই বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক উদ্ধারের ঘটনা জেলার নিরাপত্তা এবং আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্ত সাইদুল শেখ অভিযানের খবর পেয়েই এক মহিলা-সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। সাইদুল শেখের অতীত অত্যন্ত সন্দেহজনক। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বে এনডিপিএস (NDPS) আইন এবং বিস্ফোরক পদার্থ আইনে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তিনি সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁর বাড়িতে নিষিদ্ধ রাসায়নিক মজুত থাকার ঘটনায় জঙ্গি মডিউল বা বড় ধরনের নাশকতার ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

উদ্ধারকৃত অ্যান্টিমনি ট্রাইসালফাইড অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে। সুরক্ষিতভাবে সামগ্রী হ্যান্ডেল করার জন্য বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দপ্তরকে (Bomb Disposal Squad) খবর দেওয়া হয়েছে। সাইদুল শেখ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত পলাতক অন্যদের খোঁজে পুলিশের একটি দল এলাকায় তল্লাশি ও গ্রেফতারির চেষ্টা চালাচ্ছে। এই রাসায়নিকের উৎস এবং কোথায় এটি ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল, তা তদন্তের মূল ফোকাস।

এই ঘটনার পর রাণীনগর গ্রামে তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্তের পরিবার এবং প্রতিবেশীরা অবশ্য সাইদুল শেখের নির্দোষিতার দাবি তুলেছেন।

সাইদুল শেখের বৌমা দাবি করেন যে তাঁর শ্বশুরকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “পুলিশ যখন আমাদের বাড়িতে আসে, তখন আমরা কেউ বাড়িতে ছিলাম না। আমার শ্বশুর ১০ দিন ধরে বাড়িতে নেই, কোথায় গেছেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। আমার স্বামী কাজের জন্য বোম্বেতে থাকেন। আমার শ্বশুর চাষবাস করে।”

প্রতিবেশী যুবক সাহিল শেখ বলেন, “পুলিশ যখন মশলা উদ্ধার করে, তখন সাইদুল বাড়িতে ছিল না। এর আগেও তাকে পুলিশ একবার বিনা কারণে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কেউ হয়তো ষড়যন্ত্র করে বাড়িতে রেখে যেতে পারে, পুলিশের উপরে আমাদের আস্থা আছে, তারা তদন্ত করে দেখুক।”

গ্রামের আরেক বাসিন্দা বাসির শেখও ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন: “এটাই পুরো ষড়যন্ত্র। সাইদুল কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তবে মশলা উদ্ধার হচ্ছে, আমরা ভয়ে আছি।”

মুর্শিদাবাদ জেলায় বারবার বোমা এবং বিস্ফোরক তৈরির সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা জেলার আইন-শৃঙ্খলার উপর গভীর প্রশ্ন তুলছে। এই প্রসঙ্গে রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে।

বহরমপুরের বিজেপি বিধায়ক সুব্রত মৈত্র পুলিশের ভূমিকাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “বহরমপুর পুলিশ প্রশাসন মুর্শিদাবাদের সমস্ত জায়গা থেকে বোমা, অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বহুভাবে চেষ্টা করছে। সাইদুল যেহেতু আগেও এনডিপিএস কেসের আসামী, তাই এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ভালোভাবে তল্লাশি চালালে এই রকম অনেক অস্ত্র বা বোমা তৈরির সাজ সরঞ্জাম পাওয়া যাবে। মুর্শিদাবাদ বারুদের স্তূপের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ প্রশাসন যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের সাধুবাদ জানাই। সেইসঙ্গে এদের ধরে বাকি যারা যুক্ত আছে, তাদেরও দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসুক।”

জেলা তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অশোক দাস এই প্রসঙ্গে বলেন, “মুর্শিদাবাদ জেলার সম্প্রীতিকে রক্ষা করতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই লক্ষ্যকে কার্যকর করতে এই জেলার পুলিশ প্রশাসন যার মাথায় কুমার সানি রাজ, তিনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দু-চারটে লোকের জন্য এই সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জির সরকার কিছুতেই মেনে নেবে না, এদের জেলের ভিতরে রাখতে হবে। বোমা পিস্তল দিয়ে যারা এই জেলার সম্প্রীতি নষ্ট করছে, তাদের তছনছ করে দিচ্ছে এই জেলার পুলিশ প্রশাসন। সেই পুলিশ প্রশাসনকে আমরা অভিনন্দন জানাচ্ছি, এটাই মানুষ চাইছে।”

জেলা পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ জানিয়েছেন, “বোমা ও বিস্ফোরক সামগ্রীর বিরুদ্ধে চলমান বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ ১,৬০০-র বেশি বোমা উদ্ধার করেছে। এই ধারাবাহিক উদ্ধার কার্যক্রমের পর বোমা তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ শুরু করা হয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *