নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ | বিশেষ প্রতিবেদন
মুর্শিদাবাদের বোয়ালিয়াডাঙার ২৪ বছরের শচীন মণ্ডল এখন জেলার গর্ব। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তরুণ ‘থ্রো ডাউন স্পেশালিস্ট’কে ঘিরে মঙ্গলবার ও বুধবার জুড়ে জেলার বিভিন্ন মহলে দেখা গেল অভিনন্দন ও প্রশংসার ঢেউ।
শচীনের বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটে বাড়তি টান ছিল তাঁর। ব্যাট, বল আর প্রতিদিনের পরিশ্রমই ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার মূল জ্বালানি। বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে গেল এমন এক জায়গায় যেখানে তিনি হয়ে উঠলেন জাতীয় দলের সাপোর্ট স্টাফদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
গত সাড়ে তিন বছর ধরে স্মৃতি মান্ধানা, রিচা ঘোষ, জেমাইমা রডরিগেজদের নেটে থ্রো ডাউন দেওয়ার দায়িত্ব সামলেছেন শচীন। অনুশীলনে তাঁর ধারাবাহিকতা, গতি, নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে থ্রো করার দক্ষতা এবং পরিশ্রম গোটা টিম ম্যানেজমেন্টের নজর কেড়ে নেয়।
২ নভেম্বর বিশ্বজয়ের মুহূর্তে তাঁর অবদান তাই বিশেষভাবে স্বীকৃতি পায়।
২০১৯ সালে বহরমপুরের মফস্বল শহর ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে যান শচীন। জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির কাছে একটি বেসরকারি একাডেমিতে সাইড-আর্ম থ্রোয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তাঁর টেকনিক ও ধারাবাহিকতা নজরে আসে ভারতীয় মহিলা দলের নির্বাচকদের। তারপর শুরু হয় জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর যাত্রা। আজ শচীন হয়ে উঠেছেন তরুণ ক্রিকেটারদের আইডল।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বহরমপুর পৌরসভায় শচীন এবং তাঁর কোচ বিধানচন্দ্র সরকারকে সংবর্ধনা জানান পৌরপতি নাড়ুগোপাল মুখার্জী। উপস্থিত ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান স্বরূপ সাহা। নাড়ুগোপাল মুখার্জী বলেন, “ক্রিকেট আমার জীবনের অংশ ছিল। শচীন আমাদের বাংলার শচীন। মুর্শিদাবাদ থেকে জাতীয় ক্রিকেটে পৌঁছনো সহজ নয়। ও আমাদের জেলার গর্ব।” এদিন পুরসভার পক্ষ থেকে ১ লক্ষ টাকা তুলে দেন চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখার্জি।
মঙ্গলবারই ভারতীয় সনাতন হিন্দু মঞ্চের পক্ষ থেকেও শচীনকে বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
বুধবার বিকেলে জেলা কংগ্রেস ভবনেও আয়োজন করা হয় আলাদা অনুষ্ঠান। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বজয়ে শচীনের ভূমিকার স্বীকৃতি জানিয়ে তাঁকে কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা জানান জেলা কংগ্রেস নেতৃত্ব। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলার কংগ্রেস সভাপতি মনোজ চক্রবর্তী, বিভিন্ন যুব কংগ্রেস নেতারা এবং জেলা নেতৃত্বের সদস্যরা। এই সম্মাননা প্রদান করা হয় অধীর রঞ্জন চৌধুরীর পক্ষ থেকে। জেলা কংগ্রেসের বক্তব্য,
“শচীন মণ্ডলের সাফল্য শুধু পরিবারের নয়, গোটা মুর্শিদাবাদের গর্ব।”
শচীন জানান “খুবই ভালো লাগছে আমার, আমার জীবনে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছি আমার খুবি ভালো লাগছে। আমি ভাবতেই পারিনি এত দুরে যাব। আমি চাইব এই জেলা থেকেও আরও শচীন উঠে আসুক।
শচীনের যাত্রাপথ এক মফস্বল ছেলের স্বপ্ন থেকে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম এখন জেলার তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে নতুন দিশা খুলে দিয়েছে। তাঁর পরিশ্রমের গল্প অনেকের কাছে আজ অনুপ্রেরণা। মুর্শিদাবাদের ক্রিকেট কোচিং সেন্টারগুলিতে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ ক্লাস, যাতে শচীনের মতো আরও প্রতিভা উঠে আসতে পারে।
জেলার ক্রীড়ামহল মনে করছে “পুরো দেশ যখন ভারতীয় মহিলা দলের বিশ্বজয় উদযাপন করছে, মুর্শিদাবাদ উৎসব করছে শচীনকে নিয়ে।”
একদিকে শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ এবার বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের প্রধান মুখ। দেশের গৌরব এনে দেওয়ার পর রাজ্য সরকার তাঁকে দিয়েছে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মান, ডিএসপি পদ এবং ৩৪ লক্ষ টাকার পুরস্কার। একজন আন্তর্জাতিক তারকার সাফল্যকে রাজ্য যেভাবে সম্মান জানিয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসিত।
এদিকে মুর্শিদাবাদের শচীন মণ্ডল ভারতীয় মহিলা দলের বিশ্বজয়ের অন্যতম নেপথ্য নায়ক। থ্রো ডাউন স্পেশালিস্ট হিসেবে তাঁর অবদান সারাদেশই স্বীকার করছে।
জেলার মানুষের প্রশ্ন রিচা ঘোষ ডিএসপি হন, ঠিক। কোটি টাকার পুরস্কারও ভালো কিন্তু শচীন মণ্ডল কি যোগ্য স্বীকৃতি পাবেন? তিনি তো বিশ্বজয়ী দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয়দের দাবি, “শচীনেরও রাজ্য সরকারের তরফে সম্মান, স্থায়ী চাকরি বা পদোন্নতি হওয়া উচিত। ব্যাকগ্রাউন্ড নয়, কাজই তাঁর পরিচয়।” রিচা ঘোষ দেশের গর্ব এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু শচীন মণ্ডলও দেশের সাফল্যকে তুলে ধরেছেন।
মানুষের মনেই তাই দাবি যোগ্যতা ও পরিশ্রম যেখানে সমান, সেখানে সম্মানও যেন সমান হয়।