আমেরিকার সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে আদানি গোষ্ঠীর ঋণ সংকট সামাল দিতে LIC-কে চাপ দেওয়া হয়েছিল ৩.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের জন্য। এই দাবি অস্বীকার করেছে ভারতের জীবন বিমা সংস্থা (LIC)। সংস্থার বক্তব্য, সমস্ত বিনিয়োগই হয় স্বাধীনভাবে, বোর্ড অনুমোদিত নীতির ভিত্তিতে, এবং কোনো বহিরাগত শক্তির প্রভাব নেই।
নিউজ ফ্রন্ট, নয়াদিল্লি, ২৫ অক্টোবর:
আদানি গোষ্ঠীতে বিনিয়োগের ইস্যুতে ফের তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে সরকারি আধিকারিকরা মে মাসে একটি প্রস্তাব তৈরি করেন, যাতে LIC-র তহবিল থেকে প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন ডলার আদানি গোষ্ঠীর বিভিন্ন সংস্থায় বিনিয়োগের পথ তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারি হস্তক্ষেপে LIC-কে ব্যবহার করা হয়েছে আদানি গোষ্ঠীর আর্থিক সংকট সামাল দিতে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে তোলপাড়। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টি একযোগে কেন্দ্র ও LIC-র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কংগ্রেসের দাবি, “৩০ কোটি মানুষের সঞ্চিত টাকার অপব্যবহার হচ্ছে। LIC-কে চাপ দিয়ে আদানি গোষ্ঠীতে বিনিয়োগে বাধ্য করা হয়েছে।” তারা সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে।
প্রাক্তন আমলা এবং তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ জহর সরকারও সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে মে মাসে আদানির ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় ৩.৯ বিলিয়ন ডলার ঢালতে চাপ দিয়েছেন মোদি। LIC-র কাজ দরিদ্র মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া, পুঁজিপতিদের রক্ষা নয়।”
এদিকে, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে LIC। সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “LIC-র সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং স্বচ্ছ। কোনো বহিরাগত শক্তি বা সংস্থা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না। সংবাদপত্রের রিপোর্টটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সংস্থার ভাবমূর্তি নষ্ট করার লক্ষ্যে প্রকাশিত।”
LIC আরও জানিয়েছে, “আমরা কখনও কোনো এমন রোডম্যাপ তৈরি করিনি, যার মাধ্যমে আদানি গোষ্ঠীতে বিনিয়োগের নকশা ছিল। প্রতিটি বিনিয়োগ বোর্ড অনুমোদিত নীতি ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই করা হয়।”
তবে LIC-র এই ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তাঁর বক্তব্য, “ভুয়ো খবর কোনটা? করদাতাদের ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করে আদানিকে বাঁচানোর খবর ভুল, না কি অর্থমন্ত্রককে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া খবর ভুল?”
আম আদমি পার্টির তরফেও কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়েছে, “মোদিজি নিজের বন্ধুকে বাঁচাতে LIC-র মতো সংস্থার অর্থ ব্যবহার করছেন। দেশের দরিদ্র মানুষের সঞ্চয় পুঁজিপতিদের বাঁচাতে খরচ হচ্ছে।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, আদানি গোষ্ঠীতে LIC-র বিনিয়োগ নতুন নয়। ২০২৩ অর্থবর্ষের শেষে LIC-র আদানি গোষ্ঠীতে বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ৩৬,০৮৯ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বেড়ে দাঁড়ায় ৬১,৬৫৭ কোটি টাকায়। Adani Green এবং Adani Ports-এ বিনিয়োগ ১১৪ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরেই ফোর্বস ইন্ডিয়ার তথ্যানুসারে, আদানি শেয়ার মার্কেট পতনের কারণে LIC প্রায় ৭,৮৫০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের অফিশিয়াল এক্স (Twitter) হ্যান্ডেলে বলা হয়েছে,
“প্রধানমন্ত্রী নিজে নির্দেশ দেন ৩.৯ বিলিয়ন ডলার সরকারি অর্থ আদানি গোষ্ঠীতে ঢালতে। LIC-কে বাধ্য করা হয় সেই তহবিল ব্যবহার করতে। এটাই রাষ্ট্র অনুমোদিত পুঁজিবাদ—যেখানে সাধারণ মানুষের অর্থ এক ধনী গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে খরচ করা হয়।”
বিরোধীদের দাবি, “এটি শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়, সাধারণ মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।”
অন্যদিকে সরকারপক্ষের বক্তব্য, “দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।”
আদানি গোষ্ঠীতে LIC-র বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, তবে এবার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রতিবেদন তা আরও উস্কে দিয়েছে। একদিকে LIC দাবি করছে তার সিদ্ধান্ত একেবারে স্বাধীন, অন্যদিকে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে সরকারের অঘোষিত প্রভাব নিয়ে। এই বিতর্কের পরিণতি এখন নির্ভর করছে তদন্ত ও সরকারি প্রতিক্রিয়ার উপর।