দুর্গাপুরে চিকিৎসক পড়ুয়া ওড়িয়া ছাত্রীর গণধর্ষণ, তীব্র নিন্দার ঝড়,মমতাকে কড়া ব্যবস্থার আর্জি ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর

“নির্যাতিতার যন্ত্রণা আমাদের ঠিক ততটাই, যতটা ওড়িশার।”- পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ

নিউজ ফ্রন্ট, দুর্গাপুর | ১২ অক্টোবর, ২০২৫

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে এক ভয়াবহ গণধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছে গোটা রাজ্য। ঘটনায় নির্যাতিতা একজন চিকিৎসা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, যিনি আদতে ওড়িশার বাসিন্দা। শুক্রবার রাতে খাবার খেতে বেরিয়ে পড়েন তিনি ও তাঁর এক পুরুষ সহপাঠী। সেই সময়েই একদল দুষ্কৃতী তাঁদের অনুসরণ করে এবং নির্জন এলাকায় ওই তরুণীকে টেনে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ।

ঘটনার পরই স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই একাধিক সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও মর্মান্তিক। দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার চালানো হবে।”

ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি তাঁর সচিবালয়ের এক্স (X) হ্যান্ডল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ট্যাগ করে লিখেছেন,

“দুর্গাপুরে আমাদের রাজ্যের এক চিকিৎসা ছাত্রীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই দুঃখজনক ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যেন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করে।”

তিনি আরও জানান, পীড়িতার পরিবারকে ওড়িশা সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত প্রকার সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি, বাংলার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় পেজে এক্স পোস্টে বলেন,

“ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোরতম শাস্তি প্রয়োজন। অথচ কেন্দ্র সরকার এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘অপরাজিতা অ্যান্টি-রেপ বিল’ অনুমোদন না দিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। এই বিলম্বই অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে।”

এর পাশাপাশি, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের একটি অংশও পুনরায় প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন,

“আমরা চাই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। রাজ্য মন্ত্রিসভায় পাশ করিয়ে ‘অপরাজিতা বিল’ রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও অনুমোদন মেলেনি।”

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন,

“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে বাংলার কোনও মেয়েই নিরাপদ নয়। পুলিশ শুধুই মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর ভাইপোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত। অপরাধীদের রক্ষা করা হচ্ছে, আর বিরোধীদের ফাঁসানো হচ্ছে।”

বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল বলেন,

“ওড়িশা থেকে পড়তে এসে এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যদি আজও চুপ থাকেন, তাহলে রাজ্যের নারীরা আরও অসুরক্ষিত হয়ে পড়বেন। আমরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছি, কারণ আগামীকাল এই ঘটনার শিকার হতে পারে আমাদের পরিবারের মেয়েরাও।”

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য আর্চনা মজুমদার। তিনি বলেন,

“মেডিক্যাল কলেজের আশপাশে পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা বা সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। প্রশাসনের গাফিলতি স্পষ্ট। এই অবহেলা চলতে থাকলে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা অসম্ভব।”

এই ঘটনায় পশ্চিম বঙ্গ পুলিশের তরফ থেকে টুইট করে জানাও হয় “গতকাল রাতে দুর্গাপুরে একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীকে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে যে যৌন নির্যাতনের ঘটনার শিকার হতে হয়েছে, তাতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। আমরা সকলকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধীরা কোনওভাবেই শাস্তি এড়াতে পারবে না।

নির্যাতিতার যন্ত্রণা আমাদের ঠিক ততটাই, যতটা ওড়িশার। এই ঘটনার তদন্তে কোনও খামতি রাখা হবে না এবং দোষীদের ন্যায়বিচারের মুখোমুখি করা হবে। বর্তমানে নির্যাতিতা সুস্থতার পথে এবং তাঁর পরিবারের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সমস্ত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

আমরা সকলকে অনুরোধ করছি, এই ঘটনার বিষয়ে কোনও অপ্রমাণিত বা গুজবমূলক তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে না দিতে। নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নীতি একেবারে স্পষ্ট — আমরা এমন অপরাধের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) অবলম্বন করি।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, দুর্গাপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও তৃণমূল ও বিজেপির সংঘাত তীব্র হয়েছে। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি ট্যাগ করা বার্তা এবং তৃণমূলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া রাজ্য-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।

একদিকে, দোষীদের শাস্তির দাবি উঠছে সর্বত্র। অন্যদিকে, এই নির্মম ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে। তবে সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—
রাজনীতি নয়, বিচার চাই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *