দ্বারকা নদী থেকে অবৈধভাবে লাল বালি উত্তোলনের অভিযোগে কান্দি থানার পুলিশের বড়সড় অভিযান। রাতভর ধাওয়া করে ধরা পড়ল ১৮ জন অভিযুক্ত। বাজেয়াপ্ত দুটি নৌকা ও বেশ কিছু সামগ্রী। প্রশাসনের নজরদারির ফাঁক গলে চলছিল এই বালি পাচারের কারবার, অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়ল গোটা চক্র।
নিউজ ফ্রন্ট, কান্দি, মুর্শিদাবাদ, ১০ অক্টোবর:
মুর্শিদাবাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে বড়সড় সাফল্য পেল কান্দি থানার পুলিশ। উৎসবের মরশুমকে টার্গেট করে প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে রাতের অন্ধকারে দ্বারকা নদী থেকে অবৈধভাবে লাল বালি উত্তোলনের যে চক্র চলছিল, পুলিশি তৎপরতায় তার পর্দাফাঁস হয়েছে।দুর্গাপুজোর মরশুমে যখন গোটা জেলা উৎসবমুখর, তখনও অবৈধ বালি কারবারে ব্যস্ত ছিল এক সংঘবদ্ধ দল। রাতের অন্ধকারে দ্বারকা নদীর গর্ভ থেকে চুপিচুপি বালি তুলে পাচার করছিল তারা। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কান্দি থানার পুলিশ চালায় বিশেষ অভিযান, এবং হাতেনাতে ধরা পড়ে বালি মাফিয়াদের বড়সড় র্যাকেট। এই চক্রের সাথে জড়িত ১৮ জন পাচারকারীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। অবৈধ এই কারবারের রাশ টেনে ধরে নদী ও পরিবেশের সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল মুর্শিদাবাদ পুলিশ প্রশাসন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর (বুধবার) রাতে কান্দি থানায় খবর আসে — শ্রীকৃষ্ণপুর এলাকার দ্বারকা নদীতে কিছু ব্যক্তি নৌকা ব্যবহার করে অবৈধভাবে লাল বালি উত্তোলন করছে। খবর পেয়েই কান্দি থানার একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, দুটি নৌকা থেকে কয়েকজন ব্যক্তি নদীর বালি তুলছে। পুলিশ দলকে দেখে তারা পালানোর চেষ্টা করে। শুরু হয় উত্তেজনাপূর্ণ ধাওয়া। দীর্ঘক্ষণ ধরে নদীপথ ও তীরবর্তী এলাকা জুড়ে ধাওয়া করে পুলিশ অবশেষে ১৮ জনকে আটক করে।
পুলিশ সুত্রে খবর, “ধৃতদের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে বলা হলে তারা ব্যর্থ হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, নিজেদের আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছিল।”
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে দুটি নৌকা এবং বালি তোলার অন্যান্য সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কান্দি থানায় ইতিমধ্যেই একটি নির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে।
কান্দি থানার আইসি মৃণাল সিনহা জানান —
“গত কয়েকদিন ধরে খবর আসছিল, শ্রীকৃষ্ণপুর, সাবিত্রীনগর ও হিজল অঞ্চলে রাতের অন্ধকারে নদী থেকে অবৈধভাবে বালি তোলা হচ্ছে। জেলা পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি। গত রাতে অভিযান চালিয়ে ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তিনটি নৌকাও আটক করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজের নির্দেশেই এই অভিযান। প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা — অবৈধ বালি খাদান বা পাচার কোনও অবস্থাতেই চলবে না।”
শুক্রবার ধৃতদের কান্দি মহকুমা আদালতে তোলা হয়।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, এই বালি পাচার চক্রের পেছনে কোনও বড় সিন্ডিকেট বা রাজ্যের বাইরের যোগ আছে কি না। এছাড়া এই বালি কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছিল, তারও খোঁজ চলছে। অভিযোগ, এই রকম অবৈধ বালি উত্তোলনেই নদীর তলদেশ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং নদীর প্রবাহ ও পরিবেশের ওপর তার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
১৮ জন গ্রেফতার এবং নৌকা-সহ অন্যান্য সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর এই অবৈধ কারবার সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও, প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই পাচার চক্রের জাল কি কেবল এই ১৮ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এর পেছনে কি কোনো প্রভাবশালী মহল জড়িত? পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজের নির্দেশ মতো অবৈধ খাদানের বিরুদ্ধে প্রশাসন যেভাবে শূন্য সহনশীলতা নীতি নিয়েছে, আগামী দিনেও সেই ধারাবাহিক নজরদারি বজায় থাকে কিনা, সেটাই এখন এলাকার সচেতন মহলের প্রধান আলোচ্য বিষয়।