বেঙ্গালুরুতে অগ্নিকাণ্ডে মুর্শিদাবাদের ৬ পরিযায়ী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ জেলা

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদঃ

মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনে নেমে এল এক ভয়াবহ বিপর্যয়। রুজি-রোজগারের সন্ধানে ঘর ছেড়ে সুদূর কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে যাওয়া এই যুবকরাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেখানে এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর দগ্ধ হওয়া সাতজন শ্রমিকের মধ্যে ছয়জনেরই করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু মুর্শিদাবাদ জেলাকেই শোকস্তব্ধ করেনি, বরং দেশের পরিযায়ী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং তাঁদের জীবনধারণের মৌলিক অধিকার নিয়ে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল। এই ঘটনা ঘিরে হরিহরপাড়া এবং বহরমপুর ব্লকের গ্রামগুলিতে এখন শুধুই কান্নার রোল।

সোমবার রাতে কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর বীরদি কিরমানি এলাকায় নির্মাণ শ্রমিকদের থাকার ঘরে গ্যাস লিক থেকে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে। ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, চিকিৎসকরা শেষরক্ষা করতে পারেননি। শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন শ্রমিক — হরিহরপাড়ার খিদিরপুরের জাহেদ আলি, বহরমপুর থানার নাগরাজোল এলাকার মিনারুল সেখ, তাজিবুল সেখ, জিয়াবুর সেখ, সাফিজুল সেখ এবং হাসান মল্লিক। এখনও পর্যন্ত চিকিৎসাধীন রয়েছেন নূরজামান সেখ, যার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে হাসপাতাল সূত্র।

বৃহস্পতিবারই সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু বেঙ্গালুরুতে নির্মাণ শ্রমিক বোর্ডের আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আহত শ্রমিকদের জন্য ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, “যে আবাসনটিতে শ্রমিকদের রাখা হয়েছিল, সেটি নিরাপদ ছিল না। সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না।”

ঘটনার খবর পেয়েই কংগ্রেস সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, “৬ শ্রমিকের শরীরের ৮০ শতাংশের বেশি অংশ পুড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাঁদের প্রাণ রক্ষা সম্ভব হয়নি।” অধীরবাবু দ্রুত মরদেহগুলি মুর্শিদাবাদে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন।

হরিহরপাড়ার বিধায়ক নিয়ামত সেখ জানান, “আমি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্যসচিব এবং রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলামকে ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে জানিয়েছি। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে মরদেহগুলি খুব শীঘ্রই কার্গো ফ্লাইটে করে মুর্শিদাবাদে পাঠানো হবে। আমি নিজে নিশ্চিত করছি, প্রতিটি পরিবার যেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমস্ত সরকারি সাহায্য পান, তা আমি তদারকি করব।”

এদিকে, মাইগ্রান্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটি দাবি জানিয়েছে— কোম্পানি ও সরকারকে শ্রমিকদের চিকিৎসা ও মরদেহ ফেরানোর সমস্ত খরচ বহন করতে হবে। সেই সঙ্গে রাজ্য সরকারকে নিহত শ্রমিকদের পরিবারপিছু ২৫ লক্ষ টাকা ও আহতদের পরিবারপিছু ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

শোকস্তব্ধ গ্রামাঞ্চলে কেবলই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অসহায়তার আর্তি —
“ওই ছিল সংসারের একমাত্র রোজগেরে, এখন বাচ্চাগুলোকে কে দেখবে?”
পরিবারগুলির দাবি, নিহতদের পরিবারের এক সদস্যের যেন সরকারি চাকরি দেওয়া হয়, যাতে অন্তত সংসারের চাকা আবার ঘুরতে পারে।

মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়া থেকে বহরমপুর — সর্বত্র শোকের ছায়া।
যেখানে গত সপ্তাহেও ফোনে হাসির কথা শুনছিল পরিবারগুলি, আজ সেখানে নিঃশব্দ কান্না।
দেশের উন্নয়নের চাকা যারা চালায়, সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন যেন বারবার আগুনে পুড়েই ছাই হয়ে যায়— সেই বাস্তবই ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বেঙ্গালুরুর এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে এতোগুলো গরিব পরিবার তাদের প্রধান অবলম্বনকে হারাল। শোকের এই আবহাওয়ায় বর্তমানে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও শ্রমিক সংগঠনগুলি মরদেহ দ্রুত ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার কাজে যুক্ত। নিহতদের পরিবারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের যে দাবি উঠেছে, তা আদতে তাঁদের অপূরণীয় ক্ষতি পূরণের প্রতীকী প্রচেষ্টা মাত্র। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও স্পষ্ট করে দিল যে, যে শ্রমিকদের ঘামের ওপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি চলছে, তাঁদের জন্য কর্মস্থলে এবং থাকার জায়গায় ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড়সড় গাফিলতি রয়েছে। যতক্ষণ না শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ এই শোক ও প্রশ্ন মুর্শিদাবাদের আকাশেই থেকে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *