ডোমকলে ‘বোমা সংস্কৃতি’র মর্মান্তিক বলি গৃহবধূ: সীমান্ত এলাকায় মজুত বোমায় বিস্ফোরণ, ফের উত্তপ্ত রাজনীতি

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ: মুর্শিদাবাদের ডোমকল এলাকাটি যেন বারংবার ফিরে যাচ্ছে অতীতের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের পথে। একাদশীর সকালে বাড়িতে মজুত রাখা বোমার ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন এক গৃহবধূ। মুর্শিদাবাদ জেলার এই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরে যে ‘বোমা সংস্কৃতি’র শিকার, শুক্রবারের (০৩.১০.২০২৫) এই মর্মান্তিক ঘটনা যেন তারই বিপজ্জনক পুনরাবৃত্তি। আসন্ন বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে এই নাশকতার ঘটনা ডোমকলের অস্থির ও অশান্ত বাস্তবতা পুনরায় সামনে এনে দিয়েছে।

কী ঘটেছিল ঘটনাস্থলে?

শুক্রবার সকাল আনুমানিক ১১টা নাগাদ ডোমকল মহকুমার ঘোড়ামাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ঘাটপাড়ার কামুরদিয়ায় আচমকা তীব্র বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গফুর মণ্ডলের বাড়ির পিছনের অংশে বোমা মজুত ছিল। সেই বোমাগুলির বিস্ফোরণে গফুর মণ্ডলের স্ত্রী ছিদ্দাতন খাতুন গুরুতর জখম হন। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে ডোমকল মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

পুলিশের পদক্ষেপ ও প্রাথমিক তদন্ত

পুলিশ সূত্রে খবর, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে, গফুর মণ্ডল বাড়ির পিছনে বিপুল পরিমাণ বোমা মজুত করে রেখেছিলেন। সেই মজুত বোমাই ফেটে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

  • ঘটনার পরই পুলিশ মূল অভিযুক্ত গফুর মণ্ডলকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
  • ভারতীয় ন্যায় সংহিতার নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে তদন্তে নেমেছে ডোমকল থানার পুলিশ।

রাজনৈতিক তরজা: নিশানায় শাসকদল

এই বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা সরাসরি শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় তুলেছে।

  • সিপিআইএমের অভিযোগ: ডোমকল এরিয়া কমিটির সম্পাদক মোস্তফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, “এটা তৃণমূল কংগ্রেস আশ্রিত দুষ্কৃতীদের কাজ। ভোটের আগে বিরোধীদের কোণঠাসা করার জন্য বোমা মজুত করা হচ্ছিল।” তিনি আরও দাবি করেন, ডোমকলে উন্নয়নের পরিবর্তে বোমা বাঁধা ও ফেনসিডিল পাচারের মতো বেআইনি কাজ চলছে। তাঁর দাবি, যে বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেটি গিয়াস মণ্ডলের এবং পুলিশ তাকে না পেয়ে তার বাবা গফুর মণ্ডলকে ধরে নিয়ে গেছে।
  • তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া: যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের ব্লক সভাপতির সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা অবদি তাঁর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি

উদ্বেগ ও প্রশ্নচিহ্ন

বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন বিস্ফোরণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে:

১. এই বোমাগুলি কি স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য মজুত করা হয়েছিল?

২. নাকি বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা হওয়ায় এর পিছনে নাশকতামূলক উদ্দেশ্য রয়েছে?

একাদশীর দিনে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় গভীর চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। একটি নির্দোষ প্রাণহানির ঘটনায় আবারও সামনে এল ভোটকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ বাংলার অস্থির ও অশান্ত বাস্তবতা।

ডোমকলে বোমা বিস্ফোরণ এবং এক গৃহবধূর মৃত্যু নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের এক বিপজ্জনক ইঙ্গিত। বারবার কেন এই সীমান্ত এলাকায় বোমা মজুত হচ্ছে এবং কেন সেই বোমা সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে – পুলিশকে এর মূল কারণ ও যোগসূত্র খুঁজে বের করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো নাশকতামূলক কার্যকলাপ বা অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, সেই দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ডোমকলের বাসিন্দারা দ্রুত এই ভয়াবহ ‘বোমা সংস্কৃতি’ থেকে মুক্তি এবং শান্তিশৃঙ্খলার নিশ্চয়তা চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *