অপরাধ দমন ও প্রযুক্তি নিরাপত্তায় বড় পদক্ষেপ: জাতীয় স্তরে তৈরি হচ্ছে কেন্দ্রীয় IMEI ডাটাবেস

নয়াদিল্লি | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ |

দেশজুড়ে মোবাইল চুরি, প্রতারণা এবং অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহারের ঘটনা লাগাতার বেড়ে চলায় প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে দেশে চালু হতে চলেছে একটি জাতীয় স্তরের IMEI ডাটাবেস, যার মাধ্যমে দেশের সমস্ত মোবাইল ফোনের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর নিয়ন্ত্রিত ও পর্যবেক্ষণযোগ্য হবে।

🔍 IMEI কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

IMEI বা International Mobile Equipment Identity হলো প্রতিটি মোবাইল সেটের ১৫ সংখ্যার একটি অনন্য নম্বর, যা সেটিকে চিহ্নিত করে। এটি ফোন হারালে বা চুরি হলে ট্র্যাক বা ব্লক করতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধীরা সফটওয়্যার ব্যবহারে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে ব্লক হওয়া ফোনও আবার সচল করে ফেলছে, ফলে রাজ্যভিত্তিক ব্লক ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

🛡️ নতুন জাতীয় ডাটাবেস কীভাবে কাজ করবে?

✔️ কেন্দ্রীভূত IMEI রেজিস্ট্রি:
সব মোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থাকে এখন থেকে ফোন উৎপাদনের সময় বা বাজারজাত করার আগে ICDR (Indian Counterfeit Device Restriction) পোর্টালে IMEI নম্বর রেজিস্টার করতে হবে।

✔️ অপরাধ দমনে সহায়তা:
দেশের সমস্ত রাজ্য পুলিশ এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলি এই কেন্দ্রীয় ডাটাবেস থেকে সরাসরি তথ্য পাবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট IMEI ব্লক করে ফোনটিকে স্থায়ীভাবে অচল করে দেওয়া যাবে।

✔️ চুরি-প্রতারক ফোন শনাক্তকরণ সহজ হবে:
যে ফোনগুলো অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলিকে জাতীয় স্তরে ট্র্যাক করে যেকোনো রাজ্যে ব্লক করা যাবে। শুধু রাজ্যভিত্তিক নয়, সারাদেশে একযোগে ব্লক কার্যকর হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক শীর্ষ সূত্র জানিয়েছে,

“অনেক অপরাধী ব্লক হওয়া ফোনের IMEI নম্বর বদলে সেটিকে পুনরায় বাজারে চালু করছে। কিছু নির্মাতা সংস্থাও পুরনো বা বন্ধ হয়ে যাওয়া হ্যান্ডসেটের IMEI নম্বর নতুন ফোনে পুনর্ব্যবহার করছে — যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

এই পুনঃব্যবহার বন্ধে সরকারি নির্দেশ ইতিমধ্যেই জারি হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে পরীক্ষার জন্য আসা মোবাইল ফোনের IMEI নম্বরও কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে জানাতে হবে।

📊 চলতি অগ্রগতি ও ব্লককৃত IMEI-এর পরিসংখ্যান

  • এখন পর্যন্ত প্রায় ২.৮ লক্ষ IMEI নম্বর ব্লক করা হয়েছে।
  • কলকাতা, মুম্বইসহ মেট্রো শহরগুলিতে পরীক্ষামূলকভাবে IMEI ব্লকিং টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
  • মোবাইল চুরি ও প্রতারণার মামলায় এখন থেকে প্রমাণস্বরূপ IMEI রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা যাবে।

⚖️ বিশেষজ্ঞদের মত ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

উপকারিতা:

  • চুরি ও জাল ফোন বাজারে প্রবেশ রোধে সহায়ক
  • সাইবার অপরাধ ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ সহজ হবে

⚠️ চ্যালেঞ্জ:

  • গোপনীয়তা: নাগরিকদের মোবাইল ব্যবহারের তথ্য সরকারী নজরে থাকায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে
  • প্রযুক্তিগত অপব্যবহার: IMEI ক্লোনিং বা সফটওয়্যার মডিফিকেশন হয়তো সম্পূর্ণ রোধ করা যাবে না
  • সঠিক প্রয়োগ: রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বে যদি ব্যবস্থার অপপ্রয়োগ হয়, তা বিপজ্জনক হতে পারে

কেন্দ্রীয়ভাবে IMEI ডাটাবেস পরিচালনার এই পদক্ষেপ মোবাইল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, গোপনীয়তার রক্ষা ও স্বচ্ছ প্রয়োগের ওপর। আইন ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে যদি ব্যবস্থাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশজুড়ে মোবাইল প্রতারণা ও অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে এটি হবে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ।

এই প্রকল্পটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবে খুব শীঘ্রই জাতীয় স্তরে পূর্ণ রূপে চালু হওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ফোন ব্যবহারকারীদেরও সচেতন থাকতে বলা হয়েছে—IMEI নম্বর যাচাই করুন এবং সন্দেহজনক ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *