নিউজ ফ্রন্ট | বহরমপুর | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পাঁচ বছর পর অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়ল জলঙ্গীর সাহেবনগর এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে গুলি চালিয়ে দুই যুবককে হত্যার মূল অভিযুক্ত ও তৎকালীন জলঙ্গী ব্লক তৃণমূল সভাপতি তহিরুদ্দিন মণ্ডল। রবিবার রাতে কলকাতার বিধাননগর এলাকায় সাগরপাড়া থানার একটি বিশেষ দল গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
২০১৯-২০ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন এনআরসি বিরোধী আন্দোলন জোরদার হচ্ছিল, তখন মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গী ব্লকের সাহেবনগর এলাকাতেও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামেন। টানা দশদিনের প্রতিবাদের মধ্যে ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি সংঘটিত হয় ভয়াবহ ঘটনা। ওইদিন ধর্মঘট ও অবরোধ চলাকালীন দুষ্কৃতীরা আচমকাই গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আনারুল বিশ্বাস ও সালাউদ্দিন মণ্ডল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অবরোধ সরিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আগ্নেয়াস্ত্র হাতে একদল লোক সেখানে হানা দেয় ও এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। নিহতদের পরিবার ও আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ব্লক তৃণমূল সভাপতি তহিরুদ্দিন মণ্ডল। তিনি ৮-১০টি গাড়ি ও দলবল নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলন তুলে নিতে চাপ দেন এবং বাধা পেয়ে গুলি চালাতে শুরু করেন। আহতদের মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হলে, চিকিৎসকেরা দু’জনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর জলঙ্গী থানায় ৪৭/২০ নম্বর মামলা রুজু হয়। মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। এদের মধ্যে ৩ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, ৮ জন আত্মসমর্পণ করেন আদালতে। কিন্তু মূল অভিযুক্ত তহিরুদ্দিন মণ্ডল দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন।
২০২১ সালের ১ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় এবং পরে আদালত তাঁকে Proclaimed Offender অর্থাৎ ঘোষিত অপরাধী ঘোষণা করে। এরপর থেকেই পুলিশের নজরদারিতে থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে রবিবার কলকাতার বিধাননগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তহিরুদ্দিন মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে সাগরপাড়া থানার বিশেষ তদন্তকারী দল।
লালবাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসপ্রীত সিং বলেন,
“অভিযুক্ত দীর্ঘদিন ধরেই পলাতক ছিল। আমরা বিশেষ টিম গঠন করে তদন্ত ও নজরদারির মাধ্যমে এই অভিযান চালিয়েছি। ধৃতকে আদালতে তোলা হবে।”
জানা গেছে, মুর্শিদাবাদ পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ সম্প্রতি একাধিক pending ও স্পর্শকাতর মামলার নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। তহিরুদ্দিন মণ্ডলের গ্রেপ্তার সেই বৃহত্তর উদ্যোগেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
জেলা কংগ্রেস মুখপত্র জয়ন্ত দাস বলেন:
“তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গে দোষীরা সবসময় আড়ালে থাকে। পাঁচ বছর পর একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়া—এটাই তার প্রমাণ। এটা তো পাঁচ বছর আগেই হওয়া উচিত ছিল! নিশ্চয়ই পুলিশ এই গ্রেপ্তার স্বতঃস্ফূর্তভাবে করেনি। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গ এখন দুর্বৃত্তদের স্বর্গরাজ্য।
তবে আমি মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পুলিশ সুপারকে এই সাহসী পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানাই।”
মুর্শিদাবাদ জেলা সিপিআইএম সম্পাদক জামির মোল্লা বলেন:
“এই সরকারের আমলে যারা গুণ্ডা, সমাজবিরোধী—তারা নির্বিঘ্নে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। পাঁচ বছর ধরে ওই আসামি কোথায় ছিল, তা পুলিশ জানত না—এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সাধারণ একটি মামলায় পুলিশ বাড়ি গিয়ে ভাঙচুর করে, অথচ এখানে একজন প্রধান অভিযুক্তকে ধরতে পাঁচ বছর লেগে গেল! এটা পুলিশের ব্যর্থতা।”
তবে তিনি পুলিশ সুপারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন,
“এই ধরনের অভিযান যদি নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরতে পারে। প্রশাসন সত্যিই যদি সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে সদর্থক ভূমিকা নেয়, তবে আমরা সিপিআইএমের পক্ষ থেকে সবরকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সমাজকে দুর্বৃত্ত মুক্ত করতেই হবে—এটাই এখন সময়ের দাবি।“
তহিরুদ্দিন মণ্ডলের গ্রেপ্তারিকে কেন্দ্র করে জলঙ্গী, বহরমপুর থেকে কলকাতা—সর্বত্র রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্ক তুঙ্গে। বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক আশীর্বাদে রক্ষা পেয়েছেন অভিযুক্ত। তবে এই পদক্ষেপ সত্যিই যদি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হয়, তাহলে বহুদিনের বিচার বঞ্চিত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই এটি ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।