কলকাতা, সেপ্টেম্বর ২৪:
কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আলিপুর চিড়িয়াখানা ২০২৪ সালে সাড়ম্বরে উদযাপন করেছে তার ১৫০তম বার্ষিকী। এই উপলক্ষে আয়োজিত সমাপ্তি অনুষ্ঠানে রাজ্যের বনদপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা ঘোষণা করেন, সাম্প্রতিক সময়ে চিড়িয়াখানাকে কেন্দ্র করে ছড়ানো সব অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি সকলকে সতর্ক করেন, ভুল তথ্যের প্রভাবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সচেতন থাকতে হবে এবং বনদপ্তরের সকল স্তরের কর্মীদের কাজের প্রতি আরও নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করার আহ্বান জানান।
বাইট-বীরবাহা হাঁসদা বনদপ্তরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি দেবল রায় বলেন, চিড়িয়াখানার কার্যক্রম নিয়ে আগে অনর্থক প্রশ্ন উঠেছিল, যা পরে তথ্যের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে অমূলক প্রমাণিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আলিপুর চিড়িয়াখানার ভিত্তি স্থাপন হয় ১৮৭৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর, লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পল–এর তত্ত্বাবধানে। জনসাধারণের জন্য খোলা হয় ১৮৭৬ সালে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এখানে অদ্বৈত নামের কচ্ছপসহ বিরল প্রাণী রাখা হয়েছিল। জার্মান প্রযুক্তিবিদ কার্ল লুইস শোয়েন্ডলার ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী জর্জ কিং প্রাথমিকভাবে পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন।
নবাব ও ধনীরা চিড়িয়াখানার জন্য বিরল প্রাণী উপহার দিতেন। নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ বাঘ, চিতা ও গন্ডার প্রদান করেছিলেন। ১৮৭৭ সালে রামব্রহ্ম সান্যাল চিড়িয়াখানার হেডবাবু হন এবং বৈজ্ঞানিক খাদ্যতালিকা, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও প্রজনন পদ্ধতি চালু করেন। ১৮৮০ সালে দর্শকদের আকর্ষণ করতে ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হয়।
১৯শ শতকের শেষের দিকে স্বামী বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা ও স্বামী যোগানন্দ চিড়িয়াখানায় এসেছিলেন। বিবেকানন্দ চিড়িয়াখানার পরিবেশে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
বর্তমান চিড়িয়াখানা
আজ আলিপুর চিড়িয়াখানায় রয়েছে প্রায় ২,০০০ প্রাণী ও পাখি। প্রতি বছর প্রায় ৩৮ লক্ষ দর্শক এখানে ভ্রমণ করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে চালু হয়েছে বিশেষ “Birds Wings Walk-in Way”, যেখানে দর্শকরা মুক্ত অবস্থায় পাখি দেখার সুযোগ পান। এছাড়া ব্যাটারি চালিত গাড়ি ও অনলাইন টিকিট ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
চিড়িয়াখানা কলকাতা পুরসভার গ্রেড ওয়ান হেরিটেজ তালিকায় স্থান পেয়েছে এবং প্রধান প্রবেশদ্বারে বসানো হয়েছে নীল ফলক। চিড়িয়াখানার প্রাচীন গ্রন্থাগার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত, যেখানে রয়েছে রামব্রহ্ম সান্যালের হাতে লেখা চিঠি ও দুষ্প্রাপ্য বই। নিয়মিত প্রকাশিত হয় “Zoo News” পত্রিকা এবং বিশেষ দিন উপলক্ষে আয়োজিত হয় নানা অনুষ্ঠান।
শহরের শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
খাঁচার পরিবর্তে আধুনিক এনক্লোজার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ফুলে-ফসলে সাজানো বাগান— সবকিছু মিলিয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানা আজ আধুনিক, শিক্ষামূলক ও আকর্ষণীয়। এটি শুধু কলকাতার নয়, সমগ্র ভারতের গর্ব। কলকাতাবাসীর কাছে এটি শুধুমাত্র একটি চিড়িয়াখানা নয়, বরং ঐতিহ্য, ইতিহাস ও শৈশবের স্মৃতির অংশ।
১৫০ বছরের পথচলায় চিড়িয়াখানা প্রত্যক্ষ করেছে রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা পরিবর্তন। আজও এটি কলকাতাবাসী ও পর্যটকদের জন্য আনন্দ, শিক্ষা ও বিনোদনের এক অপরিহার্য কেন্দ্র।