পাঁচ বছর পর ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ, মুর্শিদাবাদে ফের ফিরে আসছে ঐতিহাসিক বেড়া ফেস্টিভ্যাল

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ:
দীর্ঘ পাঁচ বছরের বিরতির পর ফের ফিরে আসছে ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ বেড়া ফেস্টিভ্যাল। ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার পালিত এই উৎসবটি করোনা মহামারী ও মহরম মাসে শোক পালনের কারণে গত কয়েক বছর বন্ধ ছিল। এ বছর নবাব মুর্শিদকুলিখার আমলের ঐতিহ্য মেনে উৎসবটি আবার প্রথাগতভাবে উদযাপিত হবে।

বেড়া উৎসব মূলত পালিত হয় হযরত খিজির আলাই সাল্লামের উদ্দেশ্যে। বিশাল কলার ভেলায় সোনা ও রুপোর প্রদীপ প্রজ্বলন, গঙ্গার বুকে আলোর প্রতিফলন, আতশবাজির ঝলকানি এবং হাজার মানুষের সমাগমে উৎসবটি এক অনন্য রূপ ধারণ করে। কলার ভেলায় সাজানো থাকে চারটি দু’মুখো প্রতিমূর্তি—এক মুখ কুমিরের, অপরটি হাতির—যাদের মাল্য প্রদান করে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় প্রদীপ ও আতশবাজির সাথে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, “পাঁচ বছর পর এই উৎসব ফের আয়োজন হওয়ায় আমরা ভীষণ আনন্দিত। বেড়া ফেস্টিভ্যাল আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

প্রশাসনের তরফে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যাতে স্থানীয় মানুষ থেকে পর্যটক সবাই নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন। হাজারদুয়ারি চত্বরে মেলাও আয়োজিত হচ্ছে। নদীর দুই পাড়ে আলোকসজ্জা ঘিরে রঙিন আবহ তৈরি হবে, আর তা দেখার অপেক্ষায় আছে গোটা জেলা।

এস্টেট ম্যানেজার বিপ্লব সরকার জানান, উৎসবকে নির্বিঘ্নে এবং জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি যাতে কোনো রকম ফাঁকফোকর না থাকে।” তিনি আশা করেন, এই উৎসবে এক লক্ষেরও বেশি মানুষের সমাগম হবে, যার মধ্যে বিভিন্ন জেলার মানুষও থাকবেন। তাদের সুবিধার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাজেট সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট বাজেট বলা সম্ভব নয়। তবে তারা ন্যূনতম খরচে উৎসব আয়োজনের চেষ্টা করছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পাঁচ বছর পর হওয়ায় নবাবী আমলের ‘তোপখানা ঘাট’ পরিষ্কার করতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগেছে, যা একটি অতিরিক্ত খরচ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। এছাড়াও, লাইটিং এবং গতানুগতিক আতশবাজির ব্যবস্থা থাকছে। এবার ভাগীরথীর অপর পাড়েও প্যান্ডেল করা হবে এবং সেখান থেকেও আতশবাজি পোড়ানো হবে।

ছোট নবাব সৈয়দ মোহাম্মদ রেজা আলি মীর্জা উৎসবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই ‘বেড়া উৎসব’ শুরু করেছিলেন নবাব মুর্শিদকুলি খান। তার মৃত্যুর পর নবাবী আমলে তার পূর্বপুরুষরা এই প্রথা চালু রাখেন এবং তাদের কম্পাউন্ড থেকেই এটি শুরু হত। তিনি জানান, তার নানার আমলে উৎসবের ধরন পরিবর্তন হয়, এবং বর্তমানে যে জায়গা থেকে উৎসব হয়, সেটি তার নানাই বেছে নিয়েছিলেন। এই উৎসবকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তিনি রাজ্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন যে, এই অনুষ্ঠানগুলো পালন করছেন আমাদের এস্টেট ম্যানেজার বিপ্লব সরকার, যার মাধ্যমে রমজান, শবে বরাত, ঈদ, মহররমের মতো অনুষ্ঠানগুলোও যথাযথভাবে পালিত হয়।

অল ইন্ডিয়া ইমাম সংগঠনের জেলা সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এই উৎসবে তার আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মুর্শিদাবাদ একসময় বাংলার রাজধানী ছিল এবং এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত আনন্দের। তিনি বলেন, “আমরা খুবই খুশি এবং ভালো লাগছে যে দূর দূরান্ত থেকে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করবে।” তিনি আরও জানান যে, করোনার কারণে দুই বছর এবং মহররম মাসের জন্য তিন বছর ধরে উৎসব বন্ধ ছিল, যা সবার মনেই কষ্ট দিয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আবারও মুর্শিদাবাদের বুকে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ায় তিনি রাজ্য সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

আগামীকাল মুর্শিদাবাদ স্টেট ও বিচার বিভাগ যৌথভাবে এই উৎসবের আয়োজন করবে। বেড়ার সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতি এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে।সব মিলিয়ে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী ‘বেড়া উৎসব’ ফিরে আসায় স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন এবং নবাব পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত আনন্দিত। এই উৎসবটি কেবল একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নয়, বরং মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *