স্নাতক স্তরে ভর্তির মেধাতালিকা প্রকাশ: আসনের চেয়ে আবেদনকারী অনেক কম, শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যে বিতর্ক

নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতা: অবশেষে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে স্নাতক স্তরে ভর্তির প্রথম দফার মেধাতালিকা প্রকাশিত হলো। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে প্রথম দফার ক্লাস শুরুর বিস্তারিত সময়সূচিও । রাজ্যজুড়ে ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৪৬১টি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের ৯,৩৬,২১৫টি আসনের বিপরীতে মাত্র ৩,৪২,৮৭১ জন আবেদন করেছেন। এর ফলে ৬ লক্ষেরও বেশি আসন শূন্য থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

“সুপ্রিম কোর্ট কোনো রায় দেওয়ার পর হাই কোর্ট যে ফের তার বিপরীতে কোনো রায় দিতে পারে, সেটাই বিস্ময়কর। গোটা ভর্তি প্রক্রিয়া বানচাল করার জন্য অনেক মামলা মোকদ্দমা করা হয়েছিল।”ব্রাত্য বসু

ভর্তি প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু হওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। কারণ, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই সর্বভারতীয় জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা অন্যান্য প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে গেছেন। এর ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিজ্ঞান শাখার আসনগুলিতেও ব্যাপক শূন্যতা দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু অবশ্য এই বিলম্বের যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উপর দোষ চাপিয়েছেন। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো রায় দেওয়ার পর হাই কোর্ট যে ফের তার বিপরীতে কোনো রায় দিতে পারে, সেটাই বিস্ময়কর। গোটা ভর্তি প্রক্রিয়া বানচাল করার জন্য অনেক মামলা মোকদ্দমা করা হয়েছিল।” তিনি আরও দাবি করেন যে, ভর্তি প্রক্রিয়া ইউজিসি-র নির্দেশিত ১৫ই সেপ্টেম্বরের সময়সীমার মধ্যেই সম্পন্ন হবে। মন্ত্রীর এই দাবি অবশ্য অনেককেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। প্রশ্ন উঠছে, যদি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরই সব বাধা দূর হয়ে থাকে, তবে কেন দেরিতে শুরু হলো ভর্তি প্রক্রিয়া? কেনই বা লক্ষ লক্ষ আসন খালি থাকার মতো এমন চরম অব্যবস্থা তৈরি হলো?

স্নাতক স্তরে ভর্তির প্রথম দফার মেধাতালিকা প্রকাশের পর, কলেজগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ২২শে আগস্ট বিকেল ৫টা থেকে এবং চলবে ২৫শে আগস্ট পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ২৩, ২৫ এবং ২৭শে আগস্ট সশরীরে কলেজে উপস্থিত হয়ে নথি যাচাই করাতে হবে। প্রথম দফার ক্লাস শুরু হবে ২৯শে আগস্ট থেকে। এরপর, যে সকল শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের কলেজ বা আসন পরিবর্তন করতে চাইবেন, তাদের জন্য ৩১শে আগস্ট বিকেল ৫টা থেকে অনলাইনে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে।

যদি প্রথম দফার পরে কিছু আসন ফাঁকা থাকে, তাহলে দ্বিতীয় দফার (Mop Up Round) আবেদন গ্রহণ করা হবে ৩১শে আগস্ট থেকে ৩রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই পর্যায়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৪, ৬, ৮ ও ৯ই সেপ্টেম্বর সশরীরে নথি যাচাই করতে হবে। এরপর তৃতীয় পর্যায়ের আবেদন শুরু হবে ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই ধাপে প্রথম পর্যায়ে আবেদন না করা বা পছন্দের আসন না পাওয়া শিক্ষার্থীরা পুনরায় আবেদন করতে পারবেন। ১৬ই সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে এবং ১৬ ও ১৭ই সেপ্টেম্বর শেষ পর্যায়ের ভর্তি প্রক্রিয়া চলবে। সবশেষে, ২১ থেকে ২৩শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আপগ্রেডেশন রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে এবং ২৩ থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর সশরীরে নথি যাচাই করা হবে।

রাজ্যের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৪৬১টি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজে এ বছর মোট ৯৩৬২১৫টি স্নাতক আসন রয়েছে। এর মধ্যে এখনও পর্যন্ত আবেদন করেছেন প্রায় ৩,৪২,৮৭১ জন। ফলে প্রথম থেকেই ৬ লক্ষাধিক আসন ফাঁকা থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা দফতরের হিসেব অনুযায়ী, এবার মোট আবেদন পড়েছে প্রায় ২০.৭২ লক্ষ। কিন্তু এর মধ্যে আসল আবেদনকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৪২ লক্ষ। এত বিপুল আবেদন সত্ত্বেও প্রথম দফায় বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪,০২,৫৪৬টি সিট। এখন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী।

শুধু কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে ১.৫ লাখের বেশি আসন, অথচ আবেদন এসেছে মাত্র ২ লাখ ৬০০-এর মতো। বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার সিট, ভর্তি হয়েছে কেবল তিন হাজারের কাছাকাছি

শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যে এমন একটি গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আড়ালে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। যেখানে প্রায় অর্ধেক আবেদনকারীও এখনো ভর্তি হননি, সেখানে সময়সীমা নিয়ে মন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য বর্তমান সঙ্কটকে আরও হাস্যকর করে তুলেছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এ ধরনের উদাসীনতা এবং অব্যবস্থা শিক্ষার মানের উপর চরম আঘাত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *