নিউজ ফ্রন্ট, কলকাতা, ১৮ আগস্ট:
পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের বরাত থেকে সরে দাঁড়াল রাজ্য সরকার। সোমবার মন্ত্রিসভার শিল্প, পরিকাঠামো ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে করা পূর্ববর্তী চুক্তি বাতিল করে নতুন সংস্থার কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করবে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম (WBIDC)। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ইতিমধ্যেই নতুন বিজ্ঞপ্তি জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি
- ডিসেম্বর ২০২১: মুখ্যমন্ত্রী নবান্নে গৌতম আদানির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখান থেকেই তাজপুর বন্দরের রূপরেখা সামনে আসে।
- সেপ্টেম্বর ২০২২: রাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিনিয়োগে প্রকল্পের বরাত দেয় আদানি গোষ্ঠীকে।
- অক্টোবর ২০২২: ইকো পার্কে মুখ্যমন্ত্রী করন আদানির হাতে প্রকল্পের ছাড়পত্র হস্তান্তর করেন। রাজ্য শিল্পনীতিতে এটিকে একটি মাইলফলক বলে মনে করা হয়।
- জানুয়ারি ২০২৩: হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শেয়ার বাজারে কারচুপি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলে। রিপোর্ট প্রকাশের পর আদানির শেয়ার মার্কেটে ধস নামে।
- ২০২৩-২০২৪: প্রকল্পের অগ্রগতি কার্যত শূন্য। আড়াই বছরেরও বেশি সময় কেটে গেলেও কাজ শুরু হয়নি।
এর আগে ২০২৩ এর শেষের দিকে তৃণমূলের তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছিল শিল্প প্রকল্পে অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক—এমনই অভিযোগ তুললেন রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী শশী পাঁজা। তাঁর দাবি, তাজপুর বন্দরের আদানি প্রকল্প নিয়ে রাজ্য সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অনুমোদন না মেলায় প্রকল্প এগোচ্ছে না। পাঁজা জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পর্যবেক্ষণ ও ছাড়পত্রের অভাবই মূল বাধা। তবে এই অচলাবস্থা কাটাতে আলোচনা চলছে এবং সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সুত্রের খবর, “দীর্ঘদিন কাজ না এগোনোয় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছিল। রাজ্যের তরফে বারবার আদানি গোষ্ঠীকে চাপ দিয়েও কাজ শুরু করা যাচ্ছিল না। শিল্পনীতি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির স্বার্থে নতুন সংস্থা খোঁজা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না।”
নবান্ন সূত্রে খবর, খুব শীঘ্রই নতুন দরপত্র ডাকা হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা সম্পন্ন সংস্থা বাছাই করা হবে।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা বারবার দাবী করে এসেছিলো, শুরু থেকেই প্রকল্প নিয়ে স্বচ্ছতা ছিল না। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদদের মতে, তাজপুরের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে টালবাহানা শিল্পনীতির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করতে পারে।
এই প্রসঙ্গে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন” একটা পোর্ট করতে গেলে মিনিমাম ৫০০০ একর জমি অধিগ্রহন করতে হয়। জাতীয় সড়ক করতে হয়, রেলপথ করতে হয়। কিন্তু কিছুই হয় নি। সব ভাওতাবাজি।”
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, নতুন দরপত্রের মাধ্যমে হয়তো আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী বিনিয়োগকারীকে পাওয়া যাবে, যা রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে সহায়ক হবে।
তাজপুর বন্দরের সম্ভাবনা অপরিসীম। এটি চালু হলে কেবল রাজ্যের শিল্পই নয়, পূর্ব ভারতের রপ্তানি-বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কিন্তু চুক্তি বাতিলের ফলে আপাতত প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যেখানে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২৫ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ছিল। এ রাজ্যে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের আশা কতটা পূরণ হবে তা সময়ের অপেক্ষা। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে খবর পেয়ে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে এই আশায় বুক বেঁধে ছিল তাজপুরের মানুষজন। এখন দেখার বিষয়, নতুন সংস্থার হাতে গেলে কত দ্রুত কাজ শুরু হয়।