মুর্শিদাবাদের হস্তশিল্পে নতুন আশার আলো জাগাল BNCCI

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ: বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের অন্যতম কেন্দ্র মুর্শিদাবাদ। এখানকার কাঁথা স্টিচ, শঙ্খ শিল্প, শোলার কাজ, পাটের পণ্য, পিতল-কাঁসার সামগ্রী এবং মুলবেরি রেশম বস্ত্রের খ্যাতি বহু বছর ধরে দেশ-বিদেশে সমাদৃত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার অভাব, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, বাজারে প্রবেশের সীমিত সুযোগ এবং পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে এই শিল্প একপ্রকার সংকটে পড়ে ছিল।

এই পরিস্থিতিতেই শিল্পমহলে নতুন প্রাণসঞ্চার করল বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BNCCI)। ১৩ অগাস্ট, বুধবার মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন ও BNCCI-এর যৌথ উদ্যোগে জেলা সদর বহরমপুরে অনুষ্ঠিত হলো এক বিশেষ শিল্প সম্মেলন ও কর্মশালা, যেখানে জেলার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় হয়।

BNCCI-এর প্রধান ঘোষণাসমূহ:

মুর্শিদাবাদে জেলা ইউনিট স্থাপন
BNCCI ঘোষণা করেছে, মুর্শিদাবাদে তাদের একটি স্থায়ী জেলা ইউনিট গঠিত হবে। এর মূল উদ্দেশ্য—MSME উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি, বিপণন সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান।

MSME কমিটি গঠন
চেম্বার অফ কমার্স জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের, যেখানে MSME সেক্টরের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মনোনয়নের ভিত্তিতে এই কমিটি BNCCI-এর বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির সঙ্গে যুক্ত থেকে উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করবে।

বেঙ্গল ফেয়ার ২০২৫
দুর্গাপূজার আগে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে BNCCI আয়োজন করবে বেঙ্গল ফেয়ার-২০২৫”। এই বছরের বিশেষ আকর্ষণ হবে মুর্শিদাবাদের MSME ও কুটির শিল্প, যাদের জন্য থাকবে আলাদা প্যাভিলিয়ন।

হস্তশিল্পের বাজার প্রসার
মুর্শিদাবাদের কাঁথা, রেশম, শোলার কাজ, শঙ্খ ও পাট শিল্পকে দেশ-বিদেশের বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন বিক্রি
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে হস্তশিল্পীদের জন্য অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং তাঁদের ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ
নতুন নকশা, উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন কৌশল শেখাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করা হবে।

অর্থনৈতিক সহায়তা
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পীদের জন্য স্বল্প সুদের ঋণ এবং সরকারি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হবে।

মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক শ্রী রাজর্ষি মিত্র বলেন—

“আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখানে মানবসম্পদ। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে অটোমেশনে অনেক কাজ চলে যাবে, তাই এখনই শিল্প উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া জরুরি। এই জেলায় হেভি ইন্ডাস্ট্রি থেকে মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রি—সবই আছে। পাট শিল্পের উন্নতির সুযোগ আছে, কারণ বর্তমানে জুট আমদানি বন্ধ। হর্টিকালচারে মুর্শিদাবাদ অন্যতম সেরা জেলা। তবে আমের শেলফ লাইফ কম হওয়ায় এখানে প্যাকেজিং ও প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রির বড় সুযোগ রয়েছে।”

BNCCI সভাপতি অশোক বনিক বলেন—

“আমাদের ১৩৮ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। প্রথমবারের মতো মুর্শিদাবাদে আমরা এই ধরনের শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগ নিচ্ছি। আমরা এখানে মেলা আয়োজন করব, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ দেব এবং হস্তশিল্পীদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব।”

স্থানীয় এক প্রবীণ কাঁথা শিল্পী বলেন—

“অনেকদিন ধরে আমরা এ ধরনের সহায়তার অপেক্ষায় ছিলাম। BNCCI-এর এই উদ্যোগ আমাদের নতুন করে কাজের অনুপ্রেরণা দেবে।”

এই উদ্যোগ শুধু মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে পুনর্জীবিত করবে না, বরং জেলার অর্থনীতি ও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *