ইন্দোনেশিয়ায় ভারতীয় সংসদ সদস্যদের জোরালো সন্ত্রাসবিরোধী বার্তা: “অপারেশন সিঁদুর ” নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের “জিরো টলারেন্স” নীতির প্রচার

নয়াদিল্লি, ২৯ মে: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অটল অবস্থান এবং “জিরো টলারেন্স” নীতির বার্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দেশ। এরই অংশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ায় চলমান সফরকালে ভারতীয় বহুদলীয় সংসদীয় প্রতিনিধিদল উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে একতার আহ্বান জানিয়েছে।

সংসদ সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝার নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় সংসদীয় প্রতিনিধিদল ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং কূটনৈতিক মহলের সাথে বিস্তারিত আলোচনায় বসেছে। এই আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সাম্প্রতিক “অপারেশন সিঁদুর ” এবং ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার কথা।

ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল National Mandate Party এর শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশের আপসহীন অবস্থানের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছে। এই বৈঠকে উভয় পক্ষ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর আলোচনায় অংশ নেয়।

ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় আদেশ পার্টির নেতারা ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রশংসা করে বলেছেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভারতের এই দৃঢ় পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মন্তব্য করেছেন যে, সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং এর মোকাবেলায় সকল গণতান্ত্রিক দেশের একসাথে কাজ করা প্রয়োজন।

ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশের রাষ্ট্রদূতদের সাথে আয়োজিত বিশেষ বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদল “অপারেশন সিঁদুর ” এর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে। এই অপারেশনে ভারতের পরিমিত কিন্তু শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, এই অপারেশনের মাধ্যমে ভারত প্রমাণ করেছে যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দেশ কতটা সতর্ক এবং প্রস্তুত। একইসাথে এটি একটি পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপ ছিল, যা আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক নীতিমালার পূর্ণ সম্মান রেখে পরিচালিত হয়েছে।

ভারতীয় প্রতিনিধিদল তাদের আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল নিরীহ সাধারণ মানুষের উপর আঘাত হানা এবং ভারতে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করা। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই ধরনের জঘন্য কার্যকলাপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এর বিরুদ্ধে একযোগে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য বলেছেন, “সন্ত্রাসীরা যখন নিরপরাধ মানুষকে লক্ষ্য করে এবং সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তখন সেটি শুধু ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে আক্রমণ। এর জবাব আমাদের দিতেই হবে।”

আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একযোগে লড়াই করার আহ্বান। ভারতীয় প্রতিনিধিরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সন্ত্রাসবাদ একটি আন্তর্জাতিক হুমকি এবং এর মোকাবেলায় সকল দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

সঞ্জয় কুমার ঝা বলেছেন, “সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই, কোনো জাতীয়তা নেই। এটি মানবতার শত্রু। তাই এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই হতে হবে সম্মিলিত, আমাদের প্রতিক্রিয়া হতে হবে একযোগে।”

প্রতিনিধিদল জানিয়েছে যে, “অপারেশন সিঁদুর ” এর মাধ্যমে ভারতের পরিমিত কিন্তু কার্যকর প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। এই অপারেশনে ভারত প্রমাণ করেছে যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশ কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, একইসাথে আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল।

ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন কূটনৈতিক মহল থেকে জানানো হয়েছে যে, ভারতের এই পদক্ষেপ অন্যান্য দেশের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কীভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া যায়, একইসাথে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করা যায়, তার একটি নিখুঁত উদাহরণ এই অপারেশন।

আলোচনায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়া উভয় দেশই এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসেবে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এই কূটনৈতিক সফরের মাধ্যমে ভারত আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে চায়। প্রতিনিধিদল জানিয়েছে যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখে রয়েছে এবং এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য সকল দেশের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন।

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ভারতের এই উদ্যোগ অত্যন্ত স্বাগত এবং আসিয়ান দেশগুলো ভারতের সাথে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সন্ত্রাসীরা প্রায়ই ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করে। ভারতীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে, ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুজাতিক দেশে এই ধরনের অপচেষ্টা কখনোই সফল হতে পারে না।

তারা বলেছেন, “ভারতের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, তার একতায়। সন্ত্রাসীরা যতই চেষ্টা করুক, তারা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারবে না। আমাদের প্রতিক্রিয়া হবে আরও দৃঢ়, আমাদের একতা হবে আরও শক্তিশালী।”

প্রতিনিধিদল বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, ভারতের সকল সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতিমালার সম্পূর্ণ সম্মান রেখে পরিচালিত হয়। “অপারেশন সিঁদুর ” এর ক্ষেত্রেও এই নীতি পূর্ণভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

তারা জানিয়েছেন যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়।

এই কূটনৈতিক সফরের মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক মঞ্চে সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠনের দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেছে। প্রতিনিধিদল জানিয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে এই ধরনের আরও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের অবস্থান তুলে ধরা হবে।

সঞ্জয় কুমার ঝা বলেছেন, “এটি শুধু একটি সফর নয়, এটি একটি বার্তা। বিশ্বকে জানানো যে ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

ইন্দোনেশিয়ায় ভারতীয় সংসদীয় প্রতিনিধিদলের এই সফর দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার পাশাপাশি, বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

“অপারেশন সিঁদুর ” এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ভারতের নেতৃত্বের ভূমিকা আগামী দিনগুলোতে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। একইসাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের বার্তা স্পষ্ট – সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা একা নই, আমরা বিশ্বের সাথে হাত মিলিয়ে এগিয়ে চলেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *