২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা সিংহ ঠাকুর ওরফে সাধ্বী প্রজ্ঞা সহ সাতজন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দিল মুম্বইয়ের বিশেষ এনআইএ (NIA) আদালত।মুম্বাইয়ের বিশেষ জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) আদালত প্রমাণের অভাবে তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে, নিহত ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের নির্দেশও দিয়েছে আদালত।
নিউজ ফ্রন্ট, মুম্বাই, ৩১ জুলাই।
প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক টানটান আইনি নাটকের যবনিকাপাত হলো আজ। ২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা সিংহ ঠাকুর ওরফে সাধ্বী প্রজ্ঞা সহ সাতজনকেই খালাস করে দিয়েছে মুম্বাইয়ের বিশেষ জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) আদালত। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চলা এই মামলায় অভিযুক্তরা সকলেই জামিনে মুক্ত ছিলেন, আর আজ আদালতের এই রায় তাদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল।
কেন এই খালাস? আদালতের রায়ের মূল কারণগুলো
বিশেষ এনআইএ আদালত তাদের রায়ে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে, যা এই খালাসের পথ প্রশস্ত করেছে:
১. প্রমাণের অভাব: আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, মামলার তদন্তকারী সংস্থা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রমাণ করার মতো শক্তিশালী কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতের সামনে পেশ করা যায়নি।
২. তদন্তে মারাত্মক ত্রুটি: মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেছে বলে আদালত উল্লেখ করেছে। এই ত্রুটিগুলোই মামলার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা অভিযুক্তদের পক্ষে গেছে।
৩. ইউএপিএ আইনের প্রয়োগে ভুল: আদালত আরও জানিয়েছে যে, এই মামলায় বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএ (Unlawful Activities (Prevention) Act) প্রয়োগ করা যায় না। কারণ, এই আইন প্রয়োগের জন্য যে ধরনের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হয়, তা নিয়মানুযায়ী নেওয়া হয়নি। মামলার সংশ্লিষ্ট উভয় ইউএপিএ অনুমোদন আদেশেই ত্রুটি ছিল।
বিস্ফোরক সংক্রান্ত প্রমাণের অভাব
আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, অভিযুক্ত শ্রীকান্ত প্রসাদ পুরোহিতের বাড়িতে বিস্ফোরক পদার্থ রাখা বা সংগ্রহ করার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের গাফিলতির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উঠে আসে।
২০০৮ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতি
২০০৮ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর রাতে মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও শহরের ভিক্কু চকের কাছে ঘটেছিল সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ। একটি ব্যস্ত মোড়ের কাছে একটি মোটরসাইকেলে লাগানো কম তীব্রতার বোমা বিস্ফোরিত হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান এবং একশোরও বেশি মানুষ আহত হন। সাম্প্রদায়িকভাবে সংবেদনশীল এই শহরে বিস্ফোরণটি ব্যাপক আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছিল, এবং ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের ঘোষণা
আদালত তার মানবিক দিকটিও তুলে ধরেছে। রায়ের পাশাপাশি, আদালত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে:
- প্রতি নিহত ব্যক্তির পরিবারের জন্য ২ লক্ষ টাকা।
- প্রতি আহত ব্যক্তির জন্য ৫০ হাজার টাকা।
এই ক্ষতিপূরণ নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মামলার ইতিহাস ও রায়ের প্রভাব
এই মামলাটি ভারতীয় আইনি ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় পুলিশের তদন্তে শুরু হলেও, পরে এই মামলা এনআইএর হাতে চলে যায়। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা জড়িত থাকলেও, শেষ পর্যন্ত প্রমাণের অভাবে সকল অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হলো।
এই রায় ভারতীয় আইনি ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছে। এটি আবারও প্রমাণ করে যে:
- প্রমাণভিত্তিক বিচার: আদালত শুধুমাত্র প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেয়। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হয়, যা আইনের শাসনের একটি ইতিবাচক দিক।
- তদন্তের গুণমান: তদন্ত প্রক্রিয়ায় যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং ত্রুটিমুক্ত থাকা কতটা জরুরি, এই রায় তা আবারও মনে করিয়ে দিল।
- আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্ব: ইউএপিএর মতো কঠোর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে যথাযথ অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অপরিহার্য।
এই রায়ের পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এবং তদন্তকারী সংস্থার আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রায় দুই দশক পর এই রায় মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে যে, ভারতীয় আইনি ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আদালতে প্রমাণ পেশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।