জাল আধার কার্ড চক্রের পর্দাফাঁস: লালগোলা থেকে ২ জন গ্রেপ্তার, উদ্ধার আধুনিক যন্ত্রপাতি

মুর্শিদাবাদের লালগোলা থানা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে জাল আধার কার্ড ও অন্যান্য নথি তৈরির অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টার সহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশ এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আধার কার্ড তৈরি করা হচ্ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখছে। সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁতেও একই ধরনের চক্রের পর্দাফাঁস হয়েছে।

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ | ২৬ জুলাই, ২০২৫

২৬ জুলাই ২০২৫, রাত প্রায় ১২টা ১৫ মিনিট নাগাদ গোপন সূত্রের ভিত্তিতে অভিযান চালায় মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার পুলিশ। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন সংশ্লিষ্ট থানা ও গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা। চামাপাড়া গ্রামে মোঃ একতারুল ইসলাম ওরফে রাজেশ মাস্টারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে দু’জনকে হাতেনাতে ধরা হয়, যারা দীর্ঘদিন ধরেই ভুয়ো আধার কার্ড ও অন্যান্য নথিপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ।

গ্রেপ্তার দুই অভিযুক্তের নাম আবু সুফিয়ান বাড়ি রঘুনাথগঞ্জ এবং সাহিন আখতার ওরফে ইমাম বাড়ি  লালগোলার চামাপাড়ায় ।

তল্লাশিতে উদ্ধার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ভুয়ো নথিপত্র:

তল্লাশিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। অভিযুক্তদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে একাধিক অত্যাধুনিক ডিভাইস ও ভুয়ো নথিপত্র। উদ্ধার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি Acer ল্যাপটপ, LOGI HG720p ওয়েবক্যাম, Canon Scan LiDE 300 ডকুমেন্ট স্ক্যানার, Thales ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার, CMITECH আই স্ক্যানার, Lapcare USB হাব এবং প্রায় ৮ ফুট দীর্ঘ একটি হাতে তৈরি বৈদ্যুতিক বোর্ড। এছাড়াও পাওয়া গেছে একটি SanDisk পেন ড্রাইভ, Canon কালার প্রিন্টার (মডেল G2012), Epson Xerox ও স্ক্যানার মেশিন (মডেল M2140), Acer মনিটর সহ CPU এবং নজমিন আক্তারা নামে ভিন্ন ভিন্ন নম্বরযুক্ত দুটি আধার কার্ড। উদ্ধারকৃত এই সমস্ত সামগ্রী প্রমাণ করে যে একটি পূর্ণাঙ্গ ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল ওই এলাকায়।

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি:

এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই একটি নির্দিষ্ট মামলা রুজু হয়েছে এবং দুই অভিযুক্তকে ৮ দিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন সহ আদালতে পেশ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই চক্র আরও বড় ও বিস্তৃত—এতে অন্য অনেকেরও যোগ থাকতে পারে।

এসডিপিও ভগবানগোলা বিমান হালদার এই বিষয়ে বলেন:

“আমরা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেফতার করি। সেখান থেকে আধার কার্ড তৈরির কাজে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করা হয়। কারা কারা এই কাজে যুক্ত ছিল, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। অভিযুক্তদের ৮ দিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আদালতে তোলা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন: “এই চক্রটি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্যও ভুয়ো আধার কার্ড বানাচ্ছিল কি না, সেই বিষয়টিও আমরা তদন্ত করে দেখছি। কারণ, লালগোলা সরাসরি আন্তর্জাতিক সীমান্ত লাগোয়া এলাকা হওয়ায় এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

মিনাখাঁয় একই ধরনের ঘটনা:

উল্লেখ্য, মাত্র ২ দিন আগেই উত্তর ২৪ পরগণার মিনাখাঁ থানার পুলিশ ভুয়ো আধার কার্ড তৈরির অভিযোগে দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে চাপালি অঞ্চলের বকচোরা বাজারে ‘আমেনিয়া জেরক্স সেন্টার’-এ। জেরক্স সেন্টারের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল ভুয়ো আধার তৈরির অবৈধ কারবার। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ শনিবার রাতেই অভিযান চালিয়ে দু’জনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে।

আটক দু’জনকে রবিবার বসিরহাট আদালতে তোলা হলে বিচারক চার দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন। অভিযুক্তদের কাছ থেকে পুলিশ আধার কার্ড তৈরির কাজে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার সহ বেশ কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই জেরক্সের দোকানের আড়ালেই দীর্ঘদিন ধরে মোটা টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে আধার কার্ড তৈরি করে দেওয়া হতো।

আধার কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র ভুয়োভাবে তৈরি হওয়া আইন-শৃঙ্খলার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। লালগোলা থানার এই উদ্যোগ প্রশাসনের তৎপরতার পরিচয় দেয়। এখন দেখার, তদন্তে আর কারা কারা উঠে আসে এবং এই চক্র কতটা বিস্তৃত তা কত দ্রুত উদঘাটন করতে পারে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ। সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ রুখে দিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *