ডোমকলে ধরা পড়ল কোটি টাকার সাইবার চক্র! গ্রেফতার ঝাড়খণ্ডের ৩ ‘হাইটেক’ প্রতারক

মুর্শিদাবাদ পুলিশ সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে এক বড়সড় অভিযান চালিয়ে জাতীয় স্তরের একটি অনলাইন প্রতারণা চক্রের তিন মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে এই চক্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সরবরাহকারীকেও আটক করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্র কোটি কোটি টাকার সাইবার অপরাধে জড়িত ছিল।

নিউজ ফ্রন্ট, মুর্শিদাবাদ, ২৫ জুলাইঃ

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার অপরাধ দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতারণার ধরণ বদলেছে, অপরাধীরা এখন ঘরে বসেই কোটি টাকার জাল বিস্তার করছে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। এমনই এক বৃহৎ সাইবার প্রতারণা চক্রের হদিস পেল মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ। ডোমকল থেকে গ্রেফতার হয়েছে তিনজন হার্ডকোর সাইবার প্রতারক

গতকাল রাত (২৪.০৭.২০২৫), সাইবার থানার একটি বিশেষ দল মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে ডোমকলে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে তিনজন কুখ্যাত সাইবার প্রতারককে। এই অভিযান চলছিল Cyber PS Case No. 30/25, dated 18.07.2025 মামলার তদন্তের সূত্র ধরে।

গ্রেপ্তার করা হয়েছে  সালামুদ্দিন আনসারী,  কালামুদ্দিন আনসারী, এবং নিয়াজ আনসারী। এরা ডোমকলে গ্রেপ্তার হলেও এদের তিন জনের বাড়ি  ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে।

এরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় স্তরের অনলাইন প্রতারণা চক্র চালিয়ে আসছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, এরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ নাগরিকদের টার্গেট করে প্রতারণা করত এবং একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন চালাত।

এই চক্রের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সাপ্লায়ার মুকলেশ হোসেন ওরফে মুকেশ মল্লিক বাড়ি রাজধরপাড়া, বহরমপুর—তাঁকেও আগেই অর্থাৎ ২০.০৭.২০২৫ তারিখে গ্রেফতার করেছে সাইবার পুলিশ।

১৮ জুলাই বহরমপুরের মল্লিকপাড়া গ্রামের এক মহিলা অভিযোগ জানান সাইবার অপরাধ দমন শাখায়। তাঁর অভিযোগ, ২৫ জুন মুকেশ মল্লিক নামে এক ব্যক্তি ব্যাঙ্কে কেওয়াইসি আপডেটের কথা বলে তাঁর ব্যাঙ্কের পাশবই, এটিএম কার্ড এবং সিম কার্ড নিজের হেফাজতে নেন।

কয়েকদিন পর ওই মহিলার কাছে আলিপুর সাইবার ক্রাইম থানার তরফে একটি নোটিশ এসে পৌঁছয়, যেখানে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বেআইনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়। সেই অ্যাকাউন্টটি ছিল সেই একই, যার কেওয়াইসি আপডেট করার জন্য তিনি নিজের নথিপত্র মুকেশ মল্লিককে দিয়েছিলেন।

যখন তিনি মুকেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন ওই ব্যক্তি তাঁকে পুরো বিষয়টি চেপে যেতে বলেন। পরে ওই মহিলা জানতে পারেন, গ্রামের আরও বেশ কয়েকজন মহিলার সঙ্গেও একই পদ্ধতিতে প্রতারণা করা হয়েছে।

এই তথ্যের ভিত্তিতে মহিলা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে একটি এফআইআর রুজু হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ অবশেষে চিহ্নিত করে এবং গ্রেফতার করে এই প্রতারণা চক্রের মূল তিন অভিযুক্তকে।

অভিযানের সময় বিপুল সংখ্যক এটিএম কার্ড, মোবাইল ফোন, সিম কার্ড এবং অন্যান্য আপত্তিকর সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (লালবাগ) রাসপ্রীত সিং জানান:
“২০ জুলাই আমরা মুকেশ মল্লিককে গ্রেফতার করি এবং জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারি, সে বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে তিনজনের হাতে তুলে দিত। ওই অ্যাকাউন্টগুলি ব্যবহার করে প্রতারণামূলক লেনদেন করা হত।

এরপর ডোমকলে অভিযান চালিয়ে আমরা সালামুদ্দিন আনসারী, কালামুদ্দিন আনসারী এবং নিয়াজ আনসারীকে গ্রেফতার করি। মূলত, এরা ডোমকলে এসেছিল প্রতারণা চক্র চালানোর উদ্দেশ্যে।

আজ অভিযুক্তদের আদালতে পেশ করা হবে এবং আমরা ৭ দিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানাব।”

মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ এই বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, “এই অভিযুক্তরা জাতীয় স্তরের সাইবার প্রতারণা চক্র চালাত। তারা কোটি কোটি টাকার সাইবার অপরাধ করেছে। এটি একটি বড় চক্র।”

পুলিশের এই সফল অভিযান সাইবার অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চক্রের গ্রেপ্তারের ফলে দেশব্যাপী অনলাইন প্রতারণার জাল অনেকটাই দুর্বল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুলিশ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত আরও সদস্যদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট, সাইবার অপরাধ আজ আর শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক নয়—গ্রামাঞ্চলেও এই জাল বিস্তার করছে। মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কারণ এই গ্রেফতারগুলি ভবিষ্যতে এমন প্রতারণা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকেও সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো হয়েছে—অজানা নম্বর বা লিঙ্কে ক্লিক না করা, ব্যাঙ্কের তথ্য কারো সঙ্গে শেয়ার না করা, এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলেই নিকটবর্তী থানায় রিপোর্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সাইবার অপরাধ রুখতে সবাইকে হতে হবে সচেতন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *